আজঃ বুধবার ৬ মে, ২০২৬

জনগণের নৈতিকতা কীভাবে গণতান্ত্রিক নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে?

মোঃ ইয়াসির আরাফাত

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

গণতন্ত্র হল জনগণের শাসন। এই সরকার পদ্ধতিতে জনগণই সর্বেসর্বা। এটি একটি নির্দিষ্ট দেশের সরকারের সাথে জনগণের সম্মতি এবং চুক্তির একটি ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি দেশের সরকার সাধারণ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বহন করে। জনগণের নৈতিকতা প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিভিন্ন মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অধিকার রক্ষা করে এমন আইন মেনে চলার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক নীতিগুলোকে সমর্থন করে। একটি নৈতিকভাবে সচেতন সমাজ নেতাদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা দাবি করে, একই সাথে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং প্রক্রিয়াগুলোকে শক্তিশালী করে।

তাই সরকারের কোনো শাখা যদি জনগণের আস্থা হারিয়ে অন্যায় ও বৈষম্যে ভরে যায়, জনগণকে তখন কথা বলতে হবে। বৃহত্তর বা জাতীয় যৌক্তিক স্বার্থের জন্য তাদের সব অনিয়ম রুখে দাঁড়াতে হবে এবং সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নীতিগুলো প্রায়শই বাঁধাগ্রস্ত হয়, কারণ এদেশের মানুষ মনে করেন যে, এই দেশের নাগরিক হিসাবে তাদের দায়িত্ব কেবল তাদের জন্য একজন নেতা বেছে নেওয়ার মাধ্যমেই (ভোট প্রদান) শেষ হয়ে যায়। কিন্তু, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য এটা কি যথেষ্ট?

আমার মতে, গণতন্ত্র শব্দটি হচ্ছে চারটি ধাপের একটি চুক্তি যার মধ্যে রয়েছে:
১. জনগণ-জনগণ চুক্তি,
২.জনগণ-প্রতিনিধি চুক্তি,
৩. প্রতিনিধি-জনগণ এবং
৪. প্রতিনিধি-প্রতিনিধি চুক্তি।

প্রথম ধাপটি বৃহত্তর জনস্বার্থে একজন উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নিতে জনগণের ঐক্য নির্দেশ করে। দ্বিতীয় ধাপে, একজন ব্যক্তিকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেওয়ার এবং দায়িত্ব প্রদানের জন্য জনগণের ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি হল একজন প্রতিনিধি বা নেতার প্রতিটি জাতীয় কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রমাণ। সবশেষে, চতুর্থ ধাপটি সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের সর্বোচ্চ পরিমাণে সুখের জন্য বিভিন্ন প্রতিনিধি বা নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রতীক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও নীতিগুলো উল্লিখিত কোনো চুক্তির প্রকৃত বাস্তবায়ন না থাকার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ। যেহেতু, “জনগণ-জনগণ” এবং “জনগণ-প্রতিনিধি” গণতন্ত্রের প্রাথমিক ধাপ, তাই এদেশের নাগরিকদের তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে হবে, যিনি জনগণের জিজ্ঞাসা ছাড়াই জবাবদিহিতা ও দায়িত্ব নিশ্চিত করবেন। অন্যথায়, পথভ্রষ্ট হয়ে বা ভুলভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেকোনোভাবে জনগণকে দমন ও বৈষম্যের দ্বারা শোষণের চেষ্টা করবে।

এই দেশের মানুষ একজন সফল প্রার্থীর কৃতিত্ব নিতে ভালোবাসে যিনি নিয়ম-কানুন মেনে কাজ করেন, কিন্তু যোগ্য নয় এমন একজনকে নির্বাচন করার দায়ভার নিতে তারা প্রস্তুত নয়। ফলস্বরূপ, দুর্নীতি ও অসঙ্গতি দেখা দেয়। এমনকি তারা প্রতিনিধিকে তার কর্ম ও সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করতে ভয় পায়। জনগণকে জানতে হবে প্রতিনিধি বিশেষ কিছু নয়। তিনি কেবল জনসেবা ও জনগণের প্রয়োজনীয়তা সমন্বয় ও বিতরণের জন্য কাজ করছেন, তাদের প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের প্রয়োজন অনুসারে নীতি প্রণয়ন করছেন। এরই সাথে, অধিকার ও সমতার বিচ্যুতি ঘটলে তাকে অপসারণ করতে হবে ও আইনগতভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যা জনগণ কর্তৃক নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সম্পন্ন হবে।

বাংলাদেশে আরেকটি গণতন্ত্র হত্যার প্রক্রিয়া হল আর্থিক সেবা বিতরণের নির্বাচনী প্রচারণা এবং মানুষকে আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখানো যা অসাধু প্রার্থীরা নির্বাচনের কিছু সময় পূর্বে একটি দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা অর্জনের জন্য করে থাকেন। এটাতে জনগণও সাই দেয়। বিভিন্ন নেতার কাছে সাময়িক নানা পদের খাবার ও সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তারাও সন্তুষ্ট থাকে। একজন প্রার্থী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণ এসব নেতা দ্বারা প্রতিশ্রুত সাময়িক আর্থিক সহায়তা এবং লোভনীয় সুবিধার প্রলোভনে তাদের যাবতীয় অতীত ইতিহাস ও কর্মকাণ্ড ভুলে গেলেও নির্বাচিত হয়ে তাদের কথার বাস্তবায়নে ভিন্ন প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করা যায়।

সুতরাং, গনতান্ত্রিক এই দেশে সঠিক লোকের পাশাপাশি ভুল ব্যক্তিকে নির্বাচন করার জন্যেও কিন্তু জনগণই দায়ী। তারা যেন কোনো ভণ্ডামি দ্বারা সম্মোহিত না হয়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যে সঠিক ও প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন শ্রেণি, চিন্তা ও মতাদর্শের মানুষকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের জনগণকে একটি বিশেষ দলের যেকোনো ধরনের কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা বাড়াতে হবে এবং অন্যের যৌক্তিক কথা বা দাবি সহজে মেনে নেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে, নিজের ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা থাকতে হবে। যে ব্যক্তি নিজের চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ডের ভুল যত সহজে উপলব্ধি ও স্বীকার করতে পারে, সে ততটা বেশি ভালো মানুষ। জনসাধারণকে অবশ্যই একজন ব্যক্তিকে তার নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্বের গুণাবলী দ্বারা বিচার করতে হবে, দলীয়ভাবে নয়। একটি দলের আনুগত্যের ফলে তৈরি হয় সীমাবদ্ধতা, পছন্দের দলের অযোগ্য ও অসৎ প্রার্থীর গণ্ডি পেরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিতে না পারার সীমাবদ্ধতা!

এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয় ও কার্যাবলীর কঠোর ও নির্ভুল মনিটরিং প্রক্রিয়া, প্রার্থীদের শিক্ষাগত ও অন্যান্য যোগ্যতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন ও গণতন্ত্র সম্পর্কিত বিষয় সম্পর্কে জনসচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠা করা, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা ও প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। শুধু তাই নয়, জনপ্রতিনিধিদের উপযুক্ত পরিমাণে বেতন দিতে হবে যাতে জনসম্পদ থেকে চুরির প্রলোভন সৃষ্টি না হয়।

জনগণই গণতন্ত্রের প্রাণ। তারা একটি দেশের সরকার গঠনে রাষ্ট্রের প্রতিবিম্ব। “জনগণের নৈতিকতা, দায়িত্বশীল আচরণ, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতা”, এই নীতিগুলোর প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দ্বারা একটি গনতান্ত্রিক জাতি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণের ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারে পরিণত হয় এবং জনগণের অন্যায় ও অনৈতিকতা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও অসঙ্গতি আনে। তাই, বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় জনগণকে অবশ্যই গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ ও মূলনীতি জানতে হবে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত গণতন্ত্রের উপযুক্ত শিক্ষাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রসারিত করতে হবে। অন্যথায়, জনগণ অসঙ্গতি ও অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সর্বদা নীরব থাকবে এবং সরকারকে জবাবদিহি করতে এগিয়ে আসবে না, যতক্ষণ না তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। সরকারকে এই গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিটি ক্ষুদ্র অপকর্মেরও জবাব দিতে হবে! এজন্য জনগণকে প্রথমে ন্যায়পরায়ণ ও যুক্তিবাদী হতে হবে এবং ফলস্বরূপ প্রতিটি ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয়ে উঠবে।

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

দেড় মাসের শিশু নিয়ে কারাগারে যাওয়া মায়ের মুক্তি।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুবিন রাতুলকে হত্যাচেষ্টার মামলায় দেড় মাসের মেয়েকে নিয়ে কারাগারে যাওয়া যুব মহিলা লীগের কর্মী শিল্পী বেগম জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।বুধবার বেলা ১২টার কিছু আগে কাশিমপুর কারাগার থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। এসময় পরিবারের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।শিল্পীর আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী বলেন, গতকাল দুপুরে জামিন নামঞ্জুর করে শিল্পীকে কারাগারে পাঠানো হয়। সন্ধ্যায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে জামিন পান তিনি।

শিল্পীর স্বামী রহিম হোসেন সোহাগ বলেন-গরমে বাচ্চাটা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওর মা তো আগে থেকেই অসুস্থ। টেনশনের কারণে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে।শিল্পী বেগম ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে।

তেজকুনিপাড়ার রেলওয়ে কলোনি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।মঙ্গলবার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।স্বজনরা সে সময় বলেছিলেন, গত ৪ মার্চ ঢাকার আদ-দ্বীন হাসপাতাল সি সেকশনের মাধ্যমে শিল্পীর সন্তানের জন্ম হয়। এর পর বাথরুমে পড়ে বাঁ হাত ভেঙে যায় শিল্পীর।

জামিন নাকচ হওয়ার পর শিল্পী বলেন-সিজারের কাটা জায়গায় এখনো ব্যথা করে। বাচ্চাকে ঠিকমত খাওয়াতে পারি না। ও তো মরে যাবে।দেড় মাসের শিশুকে নিয়ে কারাগারে মা’– এমন খবর প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানামুখি আলোচনা শুরু হয়। সন্ধ্যায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মানবিক দিক বিবেচনা করে শিল্পীকে জামিন দেন।

রাতুলের হত্যা চেষ্টা মামলার বিবরণে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চানখারপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুবিন রাতুল। সহপাঠীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান৷ সেখানে ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী তাদের আক্রমণ করেন।

পরে আসামি শিল্পীর নির্দেশে ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় এজাহারভুক্ত আসামিরাসহ অচেনা ১২০/১৩০ জন ওই শিক্ষার্থীর তেজগাঁওয়ের বাসায় হামলা চালায়। বাসার আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র ভাংচুর করায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। তিন লাখ টাকার বিভিন্ন মালামাল লুটপাট ও চুরি করে নিয়ে যান আসামিরা। শিল্পী ও অন্য আসামিরা ওই শিক্ষার্থীর বাবা সোহেল রানাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় গত বছরের ২৫ জানুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে অচেনা ১২০/১৩০ জনকে আসামি করে শিক্ষার্থী রাতুলের মা শাহনুর খানম তেজগাঁও থানায় মামলা করেন।

গ্যাস সরবরাহ কম, জ্বালানি সংকট চাকা ঘুরছেনা চট্টগ্রামের ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্রের, চরম ভোগান্তি।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় নগরের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে, ফলে ভ্যাপসা গরমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়, এমনকি দেখা দিয়েছে পানির সংকটও।জ্বালানি সংকটের কারণে এসব বিদ্যাৎকেন্দ্রগুলোর চাকা বন্ধ রয়েছে। যার ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। উৎপাদন কমে আসলেও গরমের কারণ বাড়ছে চাহিদা। ফলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা। নগরীর রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, বৈশাখ মাসের গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।ফটিকছড়ির ব্যবসায়ী হামিদুল ইসলাম বলেন, দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। দোকানে অনলাইনভিত্তিক কাজ করতে হয়। বিদ্যুৎ ছাড়া কাজ করা যায় না। আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।পিডিবির চট্টগ্রাম নির্বাহী প্রকৌশলী ফাহমিদা জামান জানান, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী লোডশেডিং কমবেশি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২১১ দশমিক ২০ মেগাওয়াট। উৎপাদন হয় ১ হাজার ৩৫৩ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট। তবে এর মধ্যে ১৪২ দশমিক ৩০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করায় স্থানীয়ভাবে ৬৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। এর আগে বেলা ১১টায় চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৯১ দশমিক ৬০ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১ হাজার ২০০ দশমিক ৭০ মেগাওয়াট। তখন লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ৯০ মেগাওয়াট।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ১০টি কেন্দ্র উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে এনলিমা (১১৬ মেগাওয়াট), জুডিয়াক (৫৪ মেগাওয়াট), জুলধা-২ ও ৩ (প্রতিটি ১০০ মেগাওয়াট), রাউজান ১ ও ২ (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) এবং কক্সবাজারের উইন্ড প্ল্যান্ট উল্লেখযোগ্য। পিডিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার বেলা ১১টায় ১১টি ও সন্ধ্যা ৭টায় ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ছিল শূন্যের কোঠায়। এরমধ্যে ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সকাল-সন্ধ্যা উৎপাদনের বাইরে ছিল। এর মধ্যে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সকালে কিছু উৎপাদন মিললেও সন্ধ্যায় তা শূন্যে নেমে আসে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র দুটি।

বর্তমানে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহ মূলত নির্ভর করছে কয়েকটি কেন্দ্রের ওপর। সন্ধ্যার হিসাব অনুযায়ী বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ৬১২ মেগাওয়াট, শিকলবাহা কেন্দ্র থেকে ২১৮ মেগাওয়াট এবং মিরসরাইয়ের বি-আর পাওয়ার কেন্দ্র থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া গেছে।

আলোচিত খবর

ক্রুড অয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরবে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

দীর্ঘ এক মাস বন্ধ থাকার পর আবার চালু হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি।মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) আমদানি ব্যাহত হওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির ক্রুড অয়েল প্রসেসিং ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে পুরো রিফাইনারিতে। ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) সংকট কেটে যাওয়ায় উৎপাদনে ফিরছে রিফাইনারিটি।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৭ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে। এদিকে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও আরও এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আসার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রিফাইনারিতে সাধারণত সৌদি আরবের এরাবিয়ান লাইট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। প্রতিবছর চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর আর কোনো ক্রুড অয়েল দেশে আসেনি।

এতে করে প্রথমবারের মতো উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি, যা ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর নজিরবিহীন ঘটনা।পরবর্তীতে বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি। এর অংশ হিসেবে লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরব থেকে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে আনা হচ্ছে। জাহাজটি ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে এবং ৬ মে থেকে তেল খালাস শুরু হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সৌদি আরব থেকে আমদানি করা এক লাখ টন ক্রুড অয়েলবাহী একটি জাহাজ ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। জাহাজ থেকে তেল খালাস শেষে ৭ মে থেকে পরিশোধন কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, আপাতত ক্রুড অয়েলের বড় ধরনের কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। চলতি মাসেই আরও একটি জাহাজ তেল নিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে, ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ