এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। গতকাল ২৯ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) মুখোশ পরে ও পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা। এর আগে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। টানা আন্দোলনের পরও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবির বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো সাড়া না পাওয়ায় কাল বুধবার চোখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ মিছিলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে সংঘাত বা হানাহানি নয়, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমেই দাবি আদায়ের কথা জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে পরিচয়পত্র ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের ছবি সংবলিত মুখোশ হাতে নিয়ে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি স্বাধীনতা চত্বর প্রদক্ষিণ করে পুনরায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় ‘তুমি কে, আমি কে, সায়েম স্যার, সায়েম স্যার’, ‘একটি নাম, একটি সুর, সায়েম স্যার, সায়েম স্যার’, ‘মোদের দাবি একটাই, সায়েম স্যারকে ভিসি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।
আন্দোলনকে রাজনৈতিক কিংবা বহিরাগতদের কর্মসূচি হিসেবে প্রচারের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মিছিলে নিজেদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করেন বলে জানান। মিছিল শেষে শহীদ মিনার চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত বার্তা পাঠ করেন ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কাজী নাবিলা রাইসা। তিনি বলেন, চুয়েটের ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী যুক্তিযুক্ত ও ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলনে রয়েছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি বিবেচনার পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন মাধ্যমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
আন্দোলনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হিশাম বলেন, সায়েম স্যারকে উপাচার্য হিসেবে পুনর্বহালের দাবিতে টানা আট দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান ফটকে গণঅবস্থান, গণস্বাক্ষর, স্মারকলিপি প্রদান, মশাল মিছিল, গ্রাফিতি অঙ্কন ও মুখোশ মিছিল রয়েছে। সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পেলে আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো সংঘাত কিংবা হানাহানি চাই না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে চাই।
তিনি বলেন, মাত্র ৫৬ দিনে সায়েম স্যার শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। তাকে পুনর্বহালের দাবিতে এই ত্যাগ স্বীকারে তারা প্রস্তুত।
একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মৌমিতা দত্ত প্রিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে তাদের একটাই দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে পুনর্বহাল করা। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মতামতকে কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান এই শিক্ষার্থী।
এর আগে সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হুমকি ও ভয়ভীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। পিএমই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ হিল গালিব অভিযোগ করেন, কতিপয় মহল আন্দোলনকারীদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। হুমকি দিয়ে আন্দোলন দমানো যাবে না জানিয়ে তিনি অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল এবং অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানান।
এদিকে শিক্ষক সমিতির অভ্যন্তরীণ সভার খণ্ডিত অডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়, ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টার জরুরি সভার বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে। সভার বিচ্ছিন্ন বক্তব্যকে শিক্ষক সমিতির সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন অসঙ্গত ও অনভিপ্রেত বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নিরাপত্তা, ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিক্ষার গতি ফিরিয়ে আনা তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আর একদিনের জন্যও যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিগগির সশরীরে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার কথাও জানান তিনি।
এদিকে টানা আন্দোলন ও বিভিন্ন কর্মসূচির পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় এর প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে আজ বুধবার দুপুর দেড়টায় চোখে কালো কাপড় বেঁধে মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, প্রশাসনের নীরবতার প্রতিবাদ হিসেবেই এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
চুয়েটে উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ২৭ জুলাই দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে ২১ সেপ্টেম্বর অব্যাহতি দিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং চুয়েটের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে চলমান সংকট দ্রুত নিরসনের দাবি জোরালো হচ্ছে।














