আজঃ শনিবার ২০ জুন, ২০২৬

বাংলাবাজারে জেলেপাড়ায় ভোর এল বিষাদের বার্তা নিয়ে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আমার ছেলে পরীক্ষা দিতে স্কুলে গেছে। সে এখনও জানে না তার বাবা নেই। ছোট মেয়েটা শুধু বাবা, বাবা করছে। আমি তাদের কী জবাব দেব ! তুমি আমাকে কোথায় ফেলে গেলে ! সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেল মর্গে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলার ছলিমপুরের বাংলাবাজারে জেলেপাড়ার নিহত অজিত দাসের স্ত্রী টকি রাণী। সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ থানার সিটি গেইটে সড়কে দাঁড়ানো একটি কাভার্ডভ্যানে সীতাকুণ্ড থেকে আসা পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা দেয়। এতে পিকআপের পাঁচ যাত্রী নিহত ও চারজন আহত হন। এর মধ্যে অজিত দাসও রয়েছেন।

এর আগে গত রোববার ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনসা পূজা, যে পূজা চট্টগ্রামে খুবই সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। গভীর রাত পর্যন্ত সীতাকুণ্ড উপজেলার ছলিমপুরের বাংলাবাজারে জেলেপাড়ায় পূজার উৎসবে মেতেছিল সবাই। কে জানতো, আনন্দ দিনের পরের ভোরটাই আসছে তাদের জন্য বিষাদের বার্তা নিয়ে!

দূর্ঘটনায় নিহতরা হলেন- আকাশ দাস (২৬), অজিত দাস (২৪), রনি দাস (২৫), জুয়েল দাস (১৮) ও মো. সোহাগ (৩২)। এদের চারজনই বাংলাবাজার জেলেপাড়ার বাসিন্দা। সোহাগ পিকআপ ভ্যানের চালক। তার বাড়িও সীতাকুণ্ডে। সোমবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলের লাশ সামনে রেখে আহাজারি করছিলেন আকাশ দাসের মা। একটিবার ছেলেকে পাবার জন্য মায়ের আকুতিতে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন উপস্থিত লোকজনও।

তার বন্ধু বিলাস দাস সাংবাদিকদের বলেন, আকাশ, অজিত, রনিসহ আমরা বন্ধুরা গতকাল সারাদিন মনসা পূজা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে ছিলাম। ভোরে শুনি, তাদের পিকআপ সিটি গেইটে অ্যাকসিডেন্ট করেছে। প্রথমে সিটি গেইট আসি। সেখান থেকে হাসপাতালে আসি। কী থেকে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছি না ! ১০০ টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল। রাতে আর ফিরল না। সকালে শুনলাম, আমার ছেলে আর নেই!
জুয়েল দাসের বাবা গোপন দাস উদভ্রান্তের মতো হাসপাতালে ছেলের লাশ খুঁজছিলেন। ছেলের নিথর মুখ দেখে বুক চাপড়ে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, মনসাপূজা নিয়ে জুয়েল সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে ছিল। সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে রাতে আবার বের হচ্ছিল। আমি তাড়াতাড়ি ফিরতে বললাম। ১০০ টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল। রাতে আর ফিরল না। সকালে শুনলাম, আমার ছেলে আর নেই!
অজিত দাসের স্ত্রী টকি রাণীকে কোনোমতেই সামলানো যাচ্ছিল না। আহাজারি করতে করতে বারবার ছুটে গিয়ে মৃত স্বামীর বুকের ওপর পড়ছিলেন। তাদের তিন ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ে নবম শ্রেণিতে এবং ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সবার ছোট মেয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। বাবাকে চেনার আগেই পিতৃহীন হলো মেয়েটি।

নিহত রনি দাসের মা রাজবালা দাস জানান, ছেলের যখন দেড় বছর বয়স তখন তিনি স্বামীকে হারান। একমাত্র ছেলেকে অনেক কষ্টে বড় করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন ছেলেকে। বৌ এখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘ছেলেটাও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি কারে নিয়ে বাঁচব, আমার বৌমা কীভাবে বাঁচবে! তার সন্তান এসে কারে বাবা ডাকবে ?
আকাশের বন্ধু বিলাস জানান, চট্টগ্রাম নগরীর ফিশারিঘাট থেকে মাছ কিনে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বাজারে নিয়ে তারা বিক্রি করেন। প্রতিদিন ভোরে তারা ফিশারিঘাটে পৌঁছেন। সকালের মধ্যে পিকআপ ভ্যানে মাছ নিয়ে বিক্রির জন্য বাজারে পৌঁছে যান। বিলাস ভোরে ঘুম থেকে উঠতে না পারায় তাকে রেখেই অন্যরা ফিশারিঘাটে যাচ্ছিলেন। পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

আকবর শাহ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আরিফুর রহমান জানান, পিকআপ ভ্যানে চালকসহ মোট ১০ জন ছিলেন। এর মধ্যে সামনে চালকসহ তিনজন বসেছিলেন। পেছনে ছিলেন আরও সাতজন।তিনি আরও বলেন, সড়কে দাঁড়ানো ছিল কাভার্ডভ্যান। পিকআপ ভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাভার্ড ভ্যানের নিচে ঢুকে পড়ে। চালকসহ সামনে থাকা তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ হতাহতদের উদ্ধার করে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও দুজন মারা যান। এছাড়া, চিকিৎসাধীন আছেন চারজন।

ওসি আরও জানান, পিকআপ ভ্যানটির সামনের অংশ পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ ভ্যান জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়েছে। কাভার্ডভ্যানের চালক-সহকারী কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগে যানবাহনটির বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে ৮০০ কেজি চিনিসহ ২ চোরাকারবারি আটক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরে ৮০০ কেজি চোরাই চিনিসহ দুই চোরাকারবারিকে আটক করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে পতেঙ্গা থানার চরপাড়া ঘাট সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কে কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গার সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করে এদের আটক করে।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সুমন আল মুকিত জানান, একটি চক্র বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে অবৈধভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খালাস করা বিপুল পরিমাণ চিনি বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে পরিবহন করবে গোপনে এমন তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়।অভিযান চলাকালে একটি সন্দেহভাজন ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ৮০০ কেজি চিনি উদ্ধার করা হয়।

এ সময় চোরাচালানে ব্যবহৃত ট্রাকসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সুমন আল মুকিত আরো বলেন, জব্দ করা চিনি, ট্রাক এবং আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্ত্রীর মরদেহ রেখে পালালো স্বামী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাদিজা আক্তার কাশফি নামের এক গৃহবধূর মরদেহ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে পালিয়ে গেছেন স্বামী মো. মারুফ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, কাশফিকে মৃত অবস্থায় আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন স্বামী মারুফ।

কর্তব্যরত চিকিৎসক কাশফিকে মৃত ঘোষণার পরপরই মরদেহ জরুরি বিভাগে রেখে কৌশলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান তিনি। নিহতের গলায় মোটা দাগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. উপমা চৌধুরী। পরে কাশফির মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন স্বজনরা। পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ঘটনার পর থেকে স্বামী পলাতক রয়েছেন।

আলোচিত খবর

আলোচিত রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: সোহেল-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যুদণ্ড

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সি রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার দম্পতির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি সোহেলের পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্নার দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আজ রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এ রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন।এ সময় কাঠগড়ায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ছিলেন। তাদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘিরে সকাল থেকে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।


রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা।এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার কাজ শেষ হওয়ার নজির তৈরি হলো।বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে এ ধরনের মামলার বিচার কাজ এতো কম সময়ে সম্পন্ন হয়নি। আলোচিত মামলাটি বিচার শুরু থেকে রায়ের পর্যায়ে এসেছে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে।

আত্মপক্ষ শুনানি শেষে ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ঠিক করা হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে রাষ্ট্রপক্ষে কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চান। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ দুই আসামির পক্ষে যুক্তিতর্কে অংশ নেন। তিনি আসামিদের লঘুদণ্ড প্রার্থনা করেন।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে সোহেল রানার দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি দুলু। সেখানে উঠে আসে, সোহেলকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েই সেদিন রুমের দরজা খোলেন স্বপ্না।গত ২০ মে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে ঢাকার মহানগর হাকিম আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় বিচারক রায় ঘোষণা করলেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ