পটিয়ার ঐতিহাসিক কালো মসজিদ: ঈমান, অলৌকিকতা ও এক বিস্ময়কর ইতিহাস।

ইমরান হোসেন মুন্না

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এক সময় এই জনপদে নেমে এসেছিল এক ভয়ংকর বিপর্যয়—বসন্ত রোগ। চারদিকে তখন কেবল আতঙ্ক, কান্না আর অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস। চিকিৎসাব্যবস্থা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তখন তাকিয়ে ছিল একমাত্র আল্লাহর রহমতের দিকে।কিন্তু প্রশ্ন ছিল—এই ভয়াবহ রোগ থেকে মুক্তির পথ কোথায়?

দিকনির্দেশনা খুঁজতে এলাকার ধার্মিক মানুষগুলো ছুটে যান হযরত আবুল খায়ের সুলতানপুরী (রহ.)-এর দরবারে। তিনি তখন এক অবাক করা কথা বলেন—
“তোমাদের পাশেই একজন আল্লাহর ওলি রয়েছেন। তাঁর শরণাপন্ন হও। আল্লাহর দয়ায় এই রোগ থেকে মুক্তি মিলবে।”

এই কথাই যেন বদলে দেয় পুরো জনপদের ভাগ্য। স্থানীয় মানুষজন ছুটে যান হযরত মাসুম আউলিয়া (রহ.)-এর দরবারে। আর আশ্চর্যের বিষয়—আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে সেই ভয়াবহ বসন্ত রোগ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়।
এরপর থেকেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে হযরত মাসুম আউলিয়া (রহ.)-এর অলৌকিক খ্যাতি। জনশ্রুতি আছে, তিনি আরব দেশ থেকে এই অঞ্চলে আগমন করেন পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারের মহৎ উদ্দেশ্যে। আজও তাঁর মাজার ঘিরে মানুষের অগাধ ভক্তি, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অটুট।

🛕 যে মসজিদ জন্ম নিয়েছিল প্রয়োজন থেকে, টিকে আছে বিশ্বাসে

পটিয়া মূল শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের কচুয়াই গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত “কালো মসজিদ” নামে। ইতিহাস ও জনশ্রুতি বলছে, প্রায় ২৫০ বছর আগে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদতের সুবিধার্থে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

সে সময় শ্রীমাই ব্রিজ এলাকা থেকে অলিরহাট পর্যন্ত আর কোনো মসজিদ ছিল না। দূরত্ব, কষ্ট আর প্রয়োজন—সবকিছুকে জয় করেই ঈমানদার মানুষের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগে গড়ে ওঠে এই পবিত্র উপাসনালয়।

শুরুর দিকে মসজিদটি ছিল মাটি দিয়ে তৈরি, আর এর ওপর দেওয়া হতো আলকাতরার প্রলেপ। সেই প্রলেপের কারণেই মসজিদটি কালো রঙ ধারণ করে—আর তখন থেকেই এর নাম হয়ে যায় কালো মসজিদ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মাটির কাঠামো হারিয়ে যায়। ১৯৮০ সালের দিকে মসজিদের মাটির দেয়াল ভেঙে ইটের গাঁথুনিতে রূপান্তর করা হয়। আজ ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখতে মসজিদের দেয়ালে লাগানো হয়েছে কালো রঙের আধুনিক টাইলস—যেন অতীত আর বর্তমান এক সুতোয় বাঁধা।

🌙 মসজিদ, মাজার ও দ্বীন শিক্ষার এক পবিত্র কেন্দ্র

বর্তমানে মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহসহ মোট প্রায় ৮০ শতক জমির উপর এই ধর্মীয় কমপ্লেক্স বিস্তৃত। এর মধ্যে মূল মসজিদটি রয়েছে প্রায় ৪০ শতক জমির ওপর।
মসজিদের পাশেই অবস্থিত হযরত শাহ মাসুম আউলিয়া (রহ.)-এর মাজার শরীফ—যেখানে প্রতিদিন ভক্তরা এসে দোয়া, জিয়ারত ও আল্লাহর নিকট প্রার্থনায় নিমগ্ন হন। এছাড়া মসজিদের দক্ষিণ পাশে বর্তমানে এতিমখানা ও হিফজখানা নির্মাণাধীন, যা ভবিষ্যতে দ্বীন শিক্ষার নতুন আলো ছড়াবে, ইনশাআল্লাহ।

🤲 আজও কেন মানুষ ছুটে আসে কালো মসজিদে?

আজও এই ঐতিহাসিক কালো মসজিদ ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি জুমার দিন ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মুসল্লি এখানে এসে ইবাদতে শরিক হন। পাশাপাশি হযরত মাসুম আউলিয়া (রহ.)-এর মাজারে জিয়ারত করে অনেকেই খুঁজে নেন হৃদয়ের প্রশান্তি, দোয়ার কবুলিয়াত ও আত্মিক সান্ত্বনা।

মাটির দেয়াল থেকে ইটের দালানে রূপান্তরিত হলেও, এই কালো মসজিদ আজও বহন করে চলেছে তার ঈমানি ইতিহাস, অলীদের স্মৃতি ও শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাসের গল্প।

মনে হয়—এটি যেন একটি পুরোনো, অমূল্য গ্রন্থ; যার মলাট আধুনিক হলেও ভেতরের বাণী, বিশ্বাস আর ইতিহাস আজও অমলিন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা -কাদের গনি চৌধুরী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেছেন- রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা এবং তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা সাংবাদিকতার কাজ। এটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, জনগণের অধিকার রক্ষা করে এবং সমাজে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।২ আগস্ট রোববার দুপুরে গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ আয়োজিত সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এসব বলেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে ২০ জন আহত

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

রাজধানীতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। নেপচুন এক্সেসরিজ নামে একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালায়।ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন এক জরুরি বার্তায় গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।

জানা যায়, উত্তর সিটির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরখান রাজাবাড়ি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।ডিএনসিসির তথ্য অনুযায়ী, হামলায় চারজন গুরুতর আহতসহ ১৫ থেকে ২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আহত হন। গুরুতর আহত চারজনকে উত্তরা বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আলোচিত খবর

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ করেছেন

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। আজ শুক্রবার ২৪ জুলাই বিকেলে তিনি গণমাধ্যমকে নিজেই পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র এরই মধ্যে পৌঁছানো হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন।

কয়েক দিন ধরেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছিল। বঙ্গভবন সূত্রে জাবা যায়, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং পদত্যাগপত্রও প্রস্তুত করেছেন। তবে স্পিকার বিদেশ সফরে থাকায় তা জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। দায়িত্ব পালনকালে তিনি সময়ের ব্যবধানে তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মহল থেকে তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। তখন তিনি পদত্যাগ করেনননি। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালিত হয়। তবে সংসদ ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

২২ তম এরাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলো। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন জেলা ও দায়রা জজ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনা জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ