যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে ফটিকছড়ির সফল গবেষক আসুতোষ নাথ

অরুণ নাথ '

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

অরুণ নাথ : মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’— প্রচলিত এই প্রবাদটিকে যেন নিজের জীবন দিয়ে আরও একবার প্রমাণ করলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সন্তান আশুতোষ নাথ। জীবনের চরম দারিদ্র্য, অভাব আর প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে একজন সফল গবেষক। অফিস সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা সেই অভাবী তরুণের আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই গৌরবময় অবস্থান কোটি যুবকের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

অভাবের সংসার ও স্বপ্নের শুরু
…………………
আশুতোষ নাথের জন্ম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে। পরবর্তী সময়ে জীবিকার তাগিদে তাঁর পরিবার স্থানান্তরিত হয় খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে। বাবা মিলন নাথের পক্ষে ভ্রাম্যমাণ ধানভাঙা মেশিন চালিয়ে পাঁচ সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াই যেখানে ছিল নিত্যদিনের যুদ্ধ, সেখানে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। অভাব যেখানে ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই ছিল এক চরম সংগ্রাম।

​তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও দমে যাননি আশুতোষ। তাঁর পড়াশোনার অদম্য ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান বড় ভাই পরিতোষ নাথ। নিজে দর্জির কাজ (সেলাই) করে উপার্জিত অর্থের সিংহভাগই অকাতরে বিলিয়ে দিতেন ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা ও ভাইকে কাজে সাহায্য করতে হতো আশুতোষকে। ফলে পড়াশোনায় নিয়মিত মনোযোগ দেওয়া ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তনের অদম্য মানসিকতা নিয়ে তিনি লড়াই চালিয়ে যান।
​লড়াইয়ের চট্টগ্রাম অধ্যায়

​মানিকছড়ির রানী নিহার দেবী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং গিরী মৈত্রী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হন আশুতোষ। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পা রাখেন চট্টগ্রাম শহরে। ভর্তি হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঐতিহ্যবাহী হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের রসায়ন বিভাগে।

​শহরে এসে নিজের খরচ চালানো এবং পরিবারকে সচল রাখতে চকবাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি। সেখানে কম্পোজ ও গ্রাফিক্স ডিজাইনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে দ্রুত দক্ষতা অর্জন করেন। এই কাজ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই নিজের পড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও কিছুটা সাহায্য করতে শুরু করেন তিনি।
​ঢাকা আগমন ও নতুন সংগ্রাম
…………………
​স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন আশুতোষ আবেদন করেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে ‘সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ পদে। মেধার জোরে ২০১৬ সালে ঢাকায় এই চাকরিটি পেয়ে যান তিনি। আর্থিক সংকটের কারণে ঢাকা পর্যন্ত এসে চাকরিতে যোগ দেওয়াটাও তখন ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।ঢাকায় এসে সরকারি চাকরির সীমিত বেতন দিয়ে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়লে তিনি নতুন পথ খোঁজেন। দিনে অফিস আর রাতে ফ্রিল্যান্সিং— এই দ্বিমুখী পরিশ্রমে ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে তাঁর দীর্ঘদিনের আর্থিক অনটন। এরই মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে সম্পন্ন করেন স্নাতক (সম্মান)।
​বুয়েট থেকে আমেরিকা: স্বপ্নের ডানায় ভর
—————————–
চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও পড়াশোনা থামিয়ে দেননি আশুতোষ। কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সুযোগ পান দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বুয়েট’ (BUET)-এ স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) করার। বুয়েটে অধ্যয়নকালীন তাঁর মধ্যে গবেষণার প্রতি এক গভীর অনুরাগের সৃষ্টি হয়। নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নামী জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্রও প্রকাশ হতে শুরু করে।​আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গবেষণাপত্র প্রকাশের পর আশুতোষের স্বপ্ন আরও বড় হতে থাকে। বিদেশে উচ্চশিক্ষারত অন্যান্য শিক্ষার্থীদের দেখে নিজের ভেতর বুনে নেন পিএইচডি করার স্বপ্ন। অদম্য চেষ্টা আর মেধার জোরে অবশেষে ধরা দেয় কাঙ্ক্ষিত সেই সাফল্য। পূর্ণ বৃত্তি (Full Scholarship) নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ‘University of Massachusetts Boston’-এ পিএইচডি করার গৌরবময় সুযোগ পান তিনি।
​বর্তমানে মার্কিন মুলুকে আশুতোষ
————————
​সব বাধা পেরিয়ে আশুতোষ নাথ আজ সুদূর আমেরিকায়। বর্তমানে তিনি সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘মেডিসিন ও সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি’ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছেন। গবেষণার পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা শিক্ষা সহকারী হিসেবেও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।

​একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ অফিস সহকারী থেকে আমেরিকার আধুনিক গবেষণাগারে পৌঁছানোর এই পুরো যাত্রার মূল চালিকাশক্তি ছিল— সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং কখনো হাল না ছাড়ার মানসিকতা। আশুতোষ নাথ আজ প্রমাণ করেছেন, তীব্র ইচ্ছা আর লড়াকু মনোভাব থাকলে অতি সাধারণ অবস্থান থেকেও বিশ্বমঞ্চে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখা সম্ভব।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রশি ছিঁড়ে পাইলট আহত, বিদেশি জাহাজ আটক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একটি বিদেশি জাহাজ থেকে পড়ে বন্দরের নিজস্ব পাইলট আহত হয়েছেন। ‘বক্স এনডেভার’ জাহাজ থেকে মই (ল্যাডার) বেয়ে নিচে নামার সময় রশি ছিঁড়ে নিচে পড়ে যান তিনি। আহত ব্যক্তির নাম ক্যাপ্টেন আ জ ম রবিউজ্জামান। গত শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে এ ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। শনিবার (২২ আগষ্ট) সকাল থেকে তদন্ত শুরু করেছে কমিটি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জাহাজের পাশে থাকা বোটে না পড়ে গভীর সাগরে পড়ে গেলে রবিউজ্জামানের মৃত্যুঝুঁকি ছিল। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। ডান হাতে ও পিঠে আঘাত পেয়েছেন তিনি। তাকে বন্দর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনার পর জাহাজটি আটক করে বন্দরের বহির্নোঙরে চার্লি অ্যাংকরেজে নোঙর করে রাখা হয়েছে। বহির্নোঙর থেকে মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাঙ বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল জাহাজটির। এ ঘটনায় দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার (২২ আগষ্ট) সকাল থেকে তদন্ত শুরু হয়।

চট্টগ্রামে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পরিবেশ সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জামাল খান রোড সমাজ কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ, মশক নিধন, মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেল ৩টায় নগরীর চেরাগী পাহাড় চত্বরে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে জামাল খান রোডকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন, দখলমুক্ত ও নিরাপদ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এবং হকারমুক্ত ফুটপাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

আয়োজকরা জানান, জামাল খান রোডকে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন রাখা, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ, দখলমুক্ত ফুটপাত নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।কর্মসূচিতে “একটি গাছ, একটি প্রাণ—সবুজ হোক জামাল খান”, “মশক নিধন করি, সুস্থ সমাজ গড়ি” এবং “মাদককে না বলি, সুন্দর সমাজ গড়ি”—এমন বিভিন্ন সচেতনতামূলক স্লোগান দেওয়া হয়।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে চেরাগী পাহাড় চত্বরে বৃক্ষরোপণ করা হয়। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জামাল খান রোড সমাজ কল্যাণ পরিষদের আহ্বায়ক মনজুর রহমান চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ আকতার উদ্দিন ডালিম। এ সময় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মুহাম্মদ নুর উদ্দিন চৌধুরী সোহেল, শেহতাব আহম্মেদ, আজাদ হোসেন,অ্যাডভোকেট ওসমান গনি, জনাব আরিফ, জনাব ওসমান গনি, জিয়া উদ্দিন আহমেদ, মনছুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহীন আকবর খান, সরোয়ার আলম, রাশেদুল ইসলাম, শৈবাল পারিয়াল, মোহাম্মদ আমিন,সাদ, ইফতু ও সামি।

বক্তারা বলেন, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগর গড়তে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা দখলমুক্ত ফুটপাত, সুস্থ ও নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং সবুজ-পরিচ্ছন্ন জনবান্ধব জামাল খান রোড গড়ে তোলার আহ্বান জানান। কর্মসূচির সঙ্গে জামাল খান রোড দোকান মালিক সমিতি একাত্মতা প্রকাশ করে। সমিতির পক্ষে বক্তব্য রাখেন দীপঙ্কর কিশোর চৌধুরী ও ইকবাল। কর্মসূচির শেষে চেরাগী পাহাড় চত্বর থেকে জামাল খান রোড হয়ে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।“ঐক্য, সেবা ও মানবতায়—সমৃদ্ধ হোক জামাল খান”—এই প্রত্যয়ে একটি সুন্দর, সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ জামাল খান রোড গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।

আলোচিত খবর

জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আজ শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনি শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। তখন বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ