এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ছবি-৩-৬
চট্টগ্রাম ব্যুরো: চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন-সিইআইজেডে ১ লাখের অধিক লোক চাকরি করবে বলে মন্তব্য করেছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সাথে অবকাঠামোগত সবকিছু হিসাব করলে ১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে বিনিয়োগ হবে বলেও মন্তব্য করেন। সোমবার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিইআইজেডের উন্নয়নকাজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আজ যে ইনভেস্টমেন্ট এখানে হয়েছে এটা হচ্ছে আগামী ২০৩৪ সালে আমাদের যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটা হচ্ছে একটি বড় পদক্ষেপ। আমরা এক কোটি চাকরির কথা বলেছি। এখানে ১ লাখের অধিক লোক চাকরি করবে। এখানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমি যদি অবকাঠামোগত সবকিছু নিই তাহলে এখানে ১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে বিনিয়োগ হবে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখানে যত ধরনের সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট হবে, এখানে সাপ্লাই চেইন ডেভেলপ হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বাজেট অধিবেশনে আমি সাড়ে চার ঘণ্টা যে বক্তব্য দিয়েছি, তার মধ্যে সাড়ে চার পৃষ্ঠার বিষয় ছিল ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ।
যাতে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসেন এবং বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাতদিন উন্মুক্ত। এটাই বর্তমান সরকারের ভাবনায় রয়েছে। তাই বিনিয়োগের জন্য যেকোনো কিছু, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো পরিবর্তনই আমাদের ভাবনায় সর্বদা থাকে। সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিসের কথাটা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে তা কখনো বাস্তবায়িতত হয়নি। কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, এবার আমরা বাংলাদেশে সিঙ্গেল উইন্ডো পরিষেবা চালু করতে যাচ্ছি। এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা আমরা ইতোমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছি।

বাংলাদেশে আপনাদের বিনিয়োগ এবং অর্জিত মুনাফা দেশে ফেরত পাঠানোও আমরা সহজ করে দিচ্ছি, যা অতীতে একটি বড় বাধা ছিল। তাই, যেকোনো বিনিয়োগকারীর জন্য বাংলাদেশে অর্জিত মুনাফা, এমনকি তাদের মূলধনও, যখন তারা বিনিয়োগ গুটিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন যেন সহজেই দেশে ফেরত পাঠানো যায়, তার ব্যবস্থা আমরা অত্যন্ত সহজ করে দিচ্ছি।
পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি চাই চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হোক। আপনাদের অর্থ সংগ্রহের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি আপনাদের প্রকল্পে বাংলাদেশিদের অংশীদারিত্ব থাকবে। আর খরচ কমাতে, কেন প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে গিয়ে উচ্চ সুদে ঋণ নেবেন? আমাদের পুঁজিবাজারের গতি এখন ঊর্ধ্বমুখী। এটি খুব ভালো করছে। আমার মনে হয় এখানে অনেক দক্ষ লোকেরও প্রয়োজন হবে।
আর সেজন্য, আমি চীনের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করছি, আনোয়ারা বা চট্টগ্রামে একটি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করুন, কারণ এটি শিল্পগুলোর জন্য চীনা বিনিয়োগ এবং স্থানীয় বিনিয়োগ উভয়েরই জোগানের উৎস হিসেবে কাজ করবে। এছাড়াও, এটি বিদেশে চাকরি খোঁজার বিষয়টিকেও অনেক সহজ করে দেবে। আমি জানি যে সারা চীনজুড়ে বড়, মাঝারি ও ছোট অনেক দক্ষতা কেন্দ্র রয়েছে। সুতরাং, সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটিও আমাদের আরেকটি লক্ষ্য হবে।
বায়োডাইভার্সিটি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা যে বিনিয়োগ করছি এখানে, এই বিনিয়োগের সাথে সাথে আমাদের চাকরি হবে, ব্যবসা হবে, আমাদের জিডিপি গ্রোথ হবে, আমাদের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নতি হবে। সাথে সাথে আমাদের মাথায় রাখতে হবে আমাদের পরিবেশটা রক্ষা করতে হবে। আর এখানে যেটা শ্রমিকদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে এটা খুব ভালো খবর।
তাদের লিভিং স্ট্যান্ডার্ড আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে এখন শুধু ইন্ডাস্ট্রি না, ইন্ডাস্ট্রির সাথে সাথে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের কথা চিন্তা করতে হবে। তাদের লিভিং কনডিশন চিন্তা করতে হবে। সুতরাং আজকে আমরা ইনশাল্লাহ আমরা ওই জায়গায় যাচ্ছি। আমরা আজকে কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছি। কারণ আমরা ওই জায়গায় পৌঁছেছি ইনশাল্লাহ। সাধারণ মানুষের কল্যাণ, শ্রমিকদের কল্যাণ সব মাথায় রেখে আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে। পরিবেশের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমাদের জীবন-জীবিকা, সবাই যদি বেঁচে থাকতে হয়, আমাদের বায়োডাইভার্সিটি যদি রক্ষা করতে হয়, এগুলো সব মাথায় রেখে আমাদেরকে বিনিয়োগ করতে হবে।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন-সিইআইজেড) বাংলাদেশে শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এই প্রকল্প কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রতীক। এর মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারার এই ভূমিতে আজ শুধু একটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের সূচনা হচ্ছে না, বাংলাদেশে শিল্প রূপান্তরের নতুন ইতিহাস রচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় গৃহীত উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন হচ্ছে এই প্রকল্প।
সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়িত এই শিল্পাঞ্চল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদি মডেল। ৫০ বছর মেয়াদি, যা আরও ৫০ বছর নবায়নের সুযোগসহ পরিচালিত হবে, এমন কনসেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নির্বিঘ্ন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করেছে। এর মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন, সহজে ইউটিলিটি সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা পাবেন বিনিয়োগকারীরা। সরকার জি-টু-জি চুক্তির আওতায় দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি সময়মতো, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই শিল্পাঞ্চল স্থানীয় মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করবে। টেকসই শিল্পায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বক্তব্য রাখেন, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ান, সরওয়ার জামাল নিজাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, চট্টগ্রাম কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএম সাইফুল আলম, এমএম. ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মির্জা সালমান ইস্পাহানি প্রমুখ।









