
টানা চার দিনের বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের জনজীবন। মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে পানিতে তলিয়ে গেছে নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকা। বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বুধবার স্থগিত করা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি পরীক্ষাও। নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি উঠেছে।

নিচু এলাকার অনেক বাসায় পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও টয়লেট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিচতলার বাসিন্দারা।গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এদিকে নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন চশমা পাহাড় এলাকার পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে সুমাইয়া (১২) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তার লাশ উদ্ধার করেন।সুমাইয়া ওই এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেনের মেয়ে।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জোন-৪ এর উপসহকারী পরিচালক শাহ ইমরান বলেন, দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে পাহাড়ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দুর্ঘটনার সময় ঘরে থাকা সুমাইয়ার মা-বাবা বের হয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে পাশের কক্ষে থাকা সুমাইয়া বের হতে পারেনি।পরে পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়কে জমেছে কোমর সমান পানি, একই অবস্থা কাতালগঞ্জেও। পানির তোড়ে বিপর্যস্ত জনজীবন, ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন নিরাপদ স্থানে।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ সেলিম বলেছেন, বারবার লোডশেডিং হচ্ছে, অথচ জেনারেটরের তেলও শেষ। বাধ্য হয়ে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে তেল আনতে ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়েছে তাকে। অনেক কষ্টে একটি রিকশা ঠিক করলেও তার সিট পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে বলে জানান তিনি।
চকবাজারের উর্দু গলি দিয়ে পানি নেমেছে স্রোতের মতো। হাসমত উল্লাহ মুন্সেফ লেইন, তেলিপট্টি, চক সুপার মার্কেট ও কাপাসগোলায় জমে আছে কোমরসমান পানি। এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বললেন, নিজের বাসায় পানি না উঠলেও আশপাশের পুরো এলাকা কোমরসমান পানিতে ডুবে আছে। কোথাও কোথাও স্রোত এতটাই ভয়াবহ যে রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে গাড়ি চলাচলও।
এদিকে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। যান চলাচল বন্ধ হয়ে সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে।এছাড়া নগরের ইপিজেড এলাকার সড়কে জমেছে হাঁটুসমান পানি। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় পানি কোমর পর্যন্ত। এই পানি মাড়িয়েই কর্মস্থলে যেতে হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আল আমিনকে।
চান্দগাঁও আবাসিক এলাকাও পুরোপুরি তলিয়ে গেছে পানিতে। এই এলাকার পাঁচ নম্বর সড়ক থেকে প্রধান সড়কে উঠতে মাত্র এক কিলোমিটারেরও কম পথ পাড়ি দিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবু আজাদের সময় লেগেছে পুরো এক ঘণ্টা। এলাকার অনেক বাড়ির নিচতলা ডুবে গেছে পানিতে। আশপাশের ফরিদারপাড়া ও শমসেরপাড়া এলাকাও পুরোপুরি পানির নিচে। শুলকবহরের আব্দুল লতিফ সড়ক ও আশপাশের এলাকা কোমরপানিতে ডুবে আছে।
টানা বর্ষণে বুধবার নতুন করে পানি উঠেছে আরও বেশ কিছু এলাকায়। সিডিএ ১ নম্বর, সিটি গেট, জামালখানের হেমসেন লেন, নাসিরাবাদ ওমেন কলেজ এলাকা, জিইসি মোড়, ফয়’স লেক, গরিব উল্লাহ শাহ মাজার এলাকা ও ইস্পাহানি রেল গেট এলাকা তলিয়ে গেছে পানিতে।জলাবদ্ধতার কারণে অনেকের বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে গেছে ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কেউ কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে।
এদিকে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড মিলে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবু ভারী বৃষ্টি হলেই আগের মতোই তলিয়ে যাচ্ছে নগর, আর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের রাজনীতি বা কাদা ছোড়াছুড়ি না করার আহ্বান জানিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, এটি একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একদিনে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে যেকোনো শহরে বন্যা হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর রহমতে চট্টগ্রামে এখনো সেই পরিস্থিতি হয়নি। কোনো সংস্থাকে দোষারোপ না করে চসিক, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর একযোগে মাঠে থেকে কাজ করছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেনের দাবি, সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ হয়েছে এবং স্লুইস গেট ও রেগুলেটরগুলো পানি নামাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করছে। তবে এত অল্প সময়ে ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত সামাল দেওয়া যেকোনো আধুনিক শহরের জন্যই কঠিন পরীক্ষা।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী আরও দুইদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকায় প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে হচ্ছে এই বৃষ্টিপাত। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সম্ভাবনা রয়েছে আরও ভারী বৃষ্টির।
আবহাওয়াবিদ মাহমুদুল আলম জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি জারি করা হয়েছে পাহাড়ধসের সতর্কবার্তাও। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।