হুমায়ূন আহমেদ: বাংলা সাহিত্যের এক অমর কণ্ঠস্বর

আদনান আহমেদ রিফাত

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অগ্রগণ্য নাম। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে আছেন জীবনের নানা দিক, মানুষের মনের গভীরতা এবং অনুভূতির অসীম বিস্তৃতি। সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, রেডিও, টেলিভিশন—প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতিতে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করা হুমায়ূন আহমেদ বাঙালি পাঠকপ্রেমীদের কাছে রোমান্টিকতা, হাস্যরস, মানবিকতা ও মিথের মিশ্রণ হিসেবে পরিচিত।হুমায়ূন আহমেদের লেখনী শুধুমাত্র সাহিত্যিক ক্ষেত্রেই নয়, তার মানসিক বিশ্লেষণ, চরিত্রচিত্রণ এবং সৃজনশীল ভাবনায় পৃথিবীকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। তাঁর জীবনের এই দিনে, তাঁর সাহিত্যিক অবদানের মূল্যায়ন ও চর্চা করা বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের অঙ্গীকার।হুমায়ূন আহমেদের শৈশব কাটে সিলেটের নানাবাড়ি এবং পরে নেত্রকোণায় তাঁর বাবার সঙ্গে। তাঁর পিতা ছিলেন একজন সরকারী কর্মকর্তা এবং মা ছিলেন গৃহিণী। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর শৈশবকালীন সময়টাতে বেশিরভাগ সময়েই তাঁর মায়ের কাছ থেকে গল্প শুনে বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর জীবনের প্রভাব পড়েছে তার সাহিত্যকর্মে। সিলেট ও নেত্রকোণায় বেড়ে ওঠা হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ ও ভালোবাসা জন্মানোর সেরা পরিবেশ পেয়েছিলেন।তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কিছুদিন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, কিন্তু সাহিত্য চর্চায় তিনি আরও বেশি মনোযোগী হন। তারপর তিনি আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধকে উপস্থাপন করেছেন অনন্য এক ভঙ্গিতে।হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরু করেছিলেন ১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস “নন্দিত নরকে” দিয়ে। এটি ছিল একটি অন্তরঙ্গ কাহিনী, যা মানব সম্পর্ক এবং সামাজিক মানসিকতার একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ছিল। তবে তার খ্যাতি আরও বিস্তৃত হয় ১৯৭৩ সালে “শঙ্খনীল কারাগার” উপন্যাসের মাধ্যমে। এই উপন্যাসটি বিপ্লবী এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিকভাবে সচেতন পাঠকদের কাছে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রগুলির গভীরতা এবং জীবনের প্রতিটি শেডকে তুলে ধরা। তাঁর উপন্যাসে যেখানে একদিকে জীবনযাপন এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা ফুটে উঠেছে, সেখানে অপরদিকে ছিল ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং তাদের সঙ্গতিপূর্ণ মানসিকতা।তাঁর উপন্যাসে সময়ের অঙ্গনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা বা চরিত্রগুলো এমনভাবে উঠে আসে, যেগুলো সাধারণভাবে হয়তো গুরুত্ব পেতো না, কিন্তু তিনি তার ভাষায় একে অনন্য রূপ দিয়েছেন। “মধ্যরাতের মেয়ে”, “দ্বীপ”, “বিষন্নতার নদী”, “মাঝির চর”, “ক্যামেলিয়া”, “লালসবুজ”—এই সব উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ একেবারে মানবিক অনুভূতি ও চেতনার দিকগুলিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিতে আরেকটি বিশেষ অংশ ছিল তার নাটক এবং চলচ্চিত্র। ১৯৮০ সালের দশক থেকে তাঁর লেখা টেলিভিশন নাটকগুলি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। তাঁর প্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে “তিন দুষ্টু মেয়ে”,“অ্যাডভেঞ্চার”, “কোথাও কেউ নেই”,“বিষন্নতার নদী”, এবং “নদীর নাম মধু” অন্যতম। এর মধ্যে “কোথাও কেউ নেই” ছিল টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় একটি নাটক, যা দর্শকদের হৃদয়ে একটি বিশেষ জায়গা করে নেয়।

এছাড়া, হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও জনপ্রিয় ছিলেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্র “আগুন”, “শ্রাবণ মেঘের দিন”, “গহীনের শব্দ” এবং “দারুচিনি দ্বীপ” দর্শক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। সিনেমার মাধ্যমে তিনি মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে তুলে ধরেছেন।হুমায়ূন আহমেদ কখনোই রক্ষণশীল বা একরোখা ছিলেন না। তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে ধর্ম, প্রেম, দার্শনিকতা, এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মিশ্রণ ছিল। তার লেখায় ফুটে উঠেছে একধরনের আধ্যাত্মিকতা, যে আধ্যাত্মিকতার মধ্যে তিনি সমাজ, মানবতা ও নিজস্ব চেতনার একটি পরিমাপ রেখেছিলেন।ভিন্নধর্মী সুন্দর সব চরিত্র সৃষ্টি করে, তিনি পাঠকদের চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে জীবনের রূপবর্ণনা করেছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে থাকা মানবিকতা, দুর্বলতা, প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বিষাদ—সবকিছুই একে একে উঠে এসেছে।এখনো রাস্তায় মাঝে মাঝে হলুদ পাঞ্জাবি পড়া হিমুদের দেখা যায়।হিমু মিসির আলীর মত চরিত্রগুলো এভারগ্রীন। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন সাহিত্যিক, যে সাহিত্য নিয়ে কোনও না কোনও সময় নিজেদের জীবন সংশোধন করতে চেয়েছিলেন।হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে এক ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তার লেখার ঢং ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল এবং প্রাঞ্জল। পাঠক সাধারণ হলেও তিনি কঠিন সমাজ ও মনস্তত্ত্বের বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যা পাঠকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলত। তার গল্পের মধ্যে ছিল আনন্দ, কষ্ট, সুখ, দুঃখের মিশ্রণ। তবে হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মানবিক গুণাবলী। তিনি কখনোই পাঠককে শুধুমাত্র মেধার জালে আটকে রাখতেন না, বরং তাদের মনের গভীরে পৌঁছে যেতেন। হুমায়ূন আহমেদ ২০১২ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমান, কিন্তু তার সাহিত্যিক অবদান আজও বাঙালি সমাজে অমর হয়ে আছে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন, যে সাহিত্য তার অনন্য উপস্থাপনার মাধ্যমে পাঠককে না শুধুমাত্র মুগ্ধ করেছিল, বরং তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সমাজের প্রতি, ব্যক্তিত্বের প্রতি, এবং মানবিক সম্পর্কের প্রতি। মৃত্যুর পরও তাঁর বই, নাটক, চলচ্চিত্র, এবং স্মৃতিচারণ পাঠকদের মাঝে জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে।হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এক মহা প্রতিভাবান সাহিত্যিক এবং সৃষ্টিশীল ব্যক্তি। তার সাহিত্যিক জীবনের সঙ্গে এক যুগের পরিচয় ছিল, এবং এই যুগের বাংলা সাহিত্যকে তিনি এক নতুন আলোর দিকে পরিচালিত করেছিলেন। তার লেখা, নাটক এবং চলচ্চিত্রগুলি আজও বাংলা সাহিত্যকে চিরকাল সমৃদ্ধ করে রেখেছে। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক প্রয়াণে এক যুগের অবসান হলেও তার সৃষ্টি চিরকাল বাঙালি মননে বিরাজ করবে।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

নীরব সমাজব্রতী ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব আবুল হোছাইন সওদাগর (রহ.) অধ্যাপক মাওলানা এস এম ইউনুছ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

 

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত বাকলিয়া একটি ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদ। এই এলাকাকে কেন্দ্র করে একাধিক ওয়ার্ড এবং একটি প্রশাসনিক থানা। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, ধনী, দরিদ্র শ্রমজীবী ও পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার বহু মানুষের আবাসস্থল বাকলিয়া এলাকা। পূর্ব বাকলিয়ার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবুল হোছাইন (প্রকাশ বাংলাদেশ বাণিজ্য ভান্ডার)। চলন বলন আচরণে তিনি একজন নীরব ও নিরহংকার মানুষ ছিলেন। সদা হাসিমাখা চেহারা নিয়ে কথা বলতেন। কখনও কারো সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর পিতার নাম মরহুম কালা মিয়া, মাতা মরহুমা মেওয়াজান খাতুন। তিনি স্থানীয় ঘাটকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শেষ করে কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৫৮ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি পরিবারের হাল ধরেন এবং তাঁর মামা দানবীর আহমদীয়া করিমিয়া সুন্নিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব সোনামিয়া সওদাগরের ব্যবসায়িক সহায়ক হিসেবে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। অত্যন্ত সততা আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে মামার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে মামার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। মামা-ভাগিনার যৌথ প্রচেষ্টায় ব্যবসার পরিধি অধিকতর সম্প্রসারিত হয়। শুটকির আড়ত ব্যবসা ছাড়াও নতুনভাবে আমদানি ব্যবসা এবং শিল্প কারখানা, হাসেম টেক্সটাইল মিলস লি: এবং চম্পা অয়েল মিলস লি: সহ আরও নানাবিধ প্রতিষ্ঠান তিনিই তদারকি করতেন। একযুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পর নিজে আছদগঞ্জ ইসলাম কলোনীর মুখে বাংলাদেশ বাণিজ্য ভান্ডার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইমপোর্ট এক্সপোর্ট এবং শীপ ব্রেকিং সহ নানাবিধ ব্যবসার মাধ্যমে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখেন। তাঁর সামাজিক ও দ্বীনি কর্মের উন্নত নিদর্শন হচ্ছে বাকলিয়াস্থ আহমদীয়া করিমিয়া সুন্নিয়া ফাযিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা। আলহাজ্ব সোনামিয়া সওদাগর তাঁর পীর ও মুর্শিদ গাউসে জামান শাহসুফি আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রহ.) কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মামাকে নানাভাবে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে উজ্জীবিত করেন এবং ১৯৭৩ সনে প্রথমে তাঁর পীর ও মুর্শিদের নামে আহমদিয়া ফোরকানীয়া মাদ্রাসা চালু করেন। পরবর্তীতে পিতার নামসহ আহমদিয়া করিমিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা নামে ১৯৭৭ সনে দাখিল স্তরে উন্নীত করেন এবং বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করেন। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকাল হতে সুদীর্ঘ সময় তিনি এই মাদ্রাসার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। আমি ১৯৮৩ সনে এ মাদ্রাসায় সহসুপার পদে যোগদান করি। উনার অনুপ্রেরণায় ১৯৮৬ সনে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং তাঁর ঐকান্তিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় ১৯৮৯ সনে এই মাদ্রাসাকে আলিম স্তরে উন্নীত করে ১৯৯১ সনে তৎকালীন মন্ত্রী মরহুম জিয়াউদ্দিন বাবলুর সহযোগিতায় এম.পি.ও ভুক্ত করতে সক্ষম হই।

আমার সুদীর্ঘ ছয় বছর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে মাদ্রাসার সময়ে এবং দুঃসময়ে তিনি বটবৃক্ষের ছায়া দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেন এবং কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ রেখেছেন। এর জন্য আমি তাঁর কাছে ঋণী।

বৃহত্তর বাকলিয়া বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হলেও এলাকাটি শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ ছিল। আজ থেকে তিন দশক পূর্বে পূর্ব বাকলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ব্যতীত বৃহত্তর বাকলিয়ায় আর কোনো বিদ্যালয় ছিল না। এলাকার মানুষগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও তারা ছিলেন শিক্ষানুরাগী। প্রায় প্রতিটি পরিবার ছিল একটি মিনি পাঠশালা, প্রত্যেক ঘরে ঘরে লজিং মাস্টার থাকতো। তখনকার দিনে একটি প্রবাদ বাক্য ছিল, “বাকলিয়ার ভাত না খাইলে শিক্ষিত হওয়া যায় না।” বৃহত্তর চট্টগ্রামের অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদ বাকলিয়ায় লজিং থেকে শিক্ষিত হয়েছেন। বাড়িতে লজিং মাস্টার রাখা বাকলিয়ার মানুষের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। শিক্ষায় পশ্চাৎপদ এলাকাকে আলোকিত করতে স্কুল, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা ছিল সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণ করার লক্ষ্যে তিনি উত্তর-পূর্ব বাকলিয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বাস্তবায়ন কমিটির সম্পাদক ছিলেন আবুল হোছাইন সওদাগর। পরে তা নুরুল ইসলাম বি.এস.সির অর্থায়নে সানোয়ারা উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ হয়। ঐ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি ঘাটকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ছিলেন। বায়তুর জমা জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। পটিয়া বানিগ্রাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) জামে মসজিদের প্রধান উপদেষ্টাসহ বহু দ্বীনি, সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মরহুম আবুল হোসাইন ছিলেন ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক এবং সামাজিক। সমাজের গরিব দুঃখী-দুস্থ মানবতার সেবায় তিনি সবসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর সক্ষমতা অনুযায়ী সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তিনি ধর্মীয় অনুশাসন ব্যক্তিগতভাবে এবং পারিবারিকভাবে যথাযথ পালন করতেন। তিনি হুজুর কেবলা আল্লামা সৈয়দ তৈয়ব শাহ (রহ.)-এর ভক্ত ও মুরিদ ছিলেন। তিনি তাঁর সন্তানদেরকেও ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে চলতে তাগাদা দিতেন। আর্থসামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলেও তাঁর সন্তানদের সবাইকে উচ্চ শিক্ষিত করেছেন। তিনি মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে এবং অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

বাকলিয়ায় তাঁর জন্মস্থান হলেও সন্তানদের ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা শেখানোর জন্য জীবনের বেশিরভাগ সময় শহরের প্রাণকেন্দ্র আসকারদীঘির পশ্চিমপাড়, নন্দনকানন, জামালখান এলাকায় অতিবাহিত করেন এবং জীবন সায়াহ্নে নিজ এলাকায় পৈতৃক ভিটায় সুরম্য বাড়ি তৈরি করে সুখে সানন্দে শেষ জীবন সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সনের ১১ অক্টোবর শুক্রবার রাত ৯.৩০ মিনিটে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মহান আল্লাহ তাঁর জীবনের সকল খেদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে উচ্চাসনে সমাসীন করুন আমিন।

মাওলানা এস.এম.ইউনুছ:
সাবেক বিভাগীয় প্রধান
আরবী ও ইসলামি শিহ্মা বিভাগ চট্টগ্রাম কলেজ
চট্টগ্রাম।

বিউটি রানী পাল সিলেট জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

সিলেটে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সঙ্গে তাঁর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশব্যাপী আলোচনা চলে তাকে নিয়ে।

সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাখাওয়াত এরশাদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত চার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে বিউটি রানী পাল ছাড়াও সিলেট সদর উপজেলার জহিরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন লস্কর, ওসমানীনগর উপজেলার আদমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মত নুরজাহান বেগম এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর চৌধুরীবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আদরী রানী দাস রয়েছেন।

বিউটি রানী পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আলোচিত খবর

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেওয়া হবে – জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে প্রধানমন্ত্রী

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন-দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের প্রত্যেককে একে একে জবাব দেওয়া হবে। আজ ৭ নভেম্বর শনিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির আয়োজিত শোভাযাত্রার আগে এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহু বছর পর দেশের মানুষ মুক্তভাবে বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালনের সুযোগ পেয়েছে। তবে দেশের বিরুদ্ধে আবারও একটি মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। অতীতের মতো এবারও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এ দেশের মানুষকে কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা যাবেনা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল। স্বাধীনতার পেছনে মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন মহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে পারেনি। তারা সাধারণ মানুষকে দাবিয়ে রাখা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী অপশক্তিকে পরাজিত করা হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের সূচনা হয়। তবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার মেনে নিতে না পারা একটি মহল বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বারবার জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আবারও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়েও জনগণের সেই অধিকার বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টও জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে অপশক্তিকে পরাজিত করেছে।তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলন শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, একই সঙ্গে ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারী শক্তিকেও দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। বাংলাদেশের মানুষ অতীতেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের আন্দোলন ও অর্জন থামিয়ে রাখা যাবে না।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের মতো আবারও একটি মহল দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বাধাগ্রস্ত করতে চায়। একই সঙ্গে জনগণের ভোটের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে জানে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জাতীয় ঐক্যের ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
অতীতের বিভিন্ন আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের মতো এবারও ষড়যন্ত্রকারীদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি ষড়যন্ত্রের জবাব একে একে দেওয়া হবে। কোনো শক্তিই বাংলাদেশের মানুষকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ