আজঃ শনিবার ২৩ মে, ২০২৬

অমর একুশে : সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার সুনিশ্চিত করা জরুরী 🇧🇩 ফজল আহমেদ

লেখক : প্রবন্ধকার ও মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড, চট্টগ্রাম। সাবেক যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

অমর একুশের এই দিনে সকল ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন


২১ শে ফেব্রুয়ারি যুগে যুগে বাঙালি জাতির জন্য প্রেরণার উৎস। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার ঊর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলার জনগণের মনে গভীর ক্ষোভের দানা বাঁধতে শুরু করে এবং মাতৃভাষা বাংলাকে সম-মর্যাদার দাবিতে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙলো। এসময় পুলিশ মিছিলের উপর গুলি ছুড়লে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই শহিদ হন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ। শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারারুদ্ধ।

তীব্র ভাষা আন্দোলনের মুখে পড়ে বাংলা ভাষাকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানী সরকার এবং ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিলে ২৩ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু, সংসদের দৈনন্দিন কার্যাবলী বাংলায় চালু প্রসঙ্গে আইন সভায় তুলে ধরেছিলেন এবং ১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী পালনেও বলিষ্ঠ ভূমিকায় ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাীধনতা লাভ করে বাঙালি জাতি। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীনের পর মহান সংবিধানে বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে ভাষণটিও বঙ্গবন্ধু বাংলায় দিয়েছিলেন।

যেটি বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে ও বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সকল অফিসের কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারী নির্দেশ জারি করেন। স্বাধীনতার পর থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারী এই দিনটি জাতীয় শহীদ দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। ২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা এখন বিশ্বের বহু দেশে গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে প্রতি বছর উদ্যাপিত হয়। মাতৃভাষার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অবদান বাংলা ভাষাবাসীদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষার প্রতি চরম উদাসীন। তারা শুদ্ধরূপে বাংলা ভাষার চর্চাকে গুরুত্ব না দিয়ে ইংরেজি-হিন্দি ভাষা মিশিয়ে ফরমালিনের থেকে বেশি বিষাক্ত করে তুলছে আমাদের মাতৃ ভাষা বাংলাকে। যেখানে পুরো বিশ্বে একমাত্র জাতি হিসেবে বাঙালিই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে ও বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সেই বাঙালির মাতৃভাষা আজ বিলুপ্তি বা হুমকির মুখে। যত্রতত্র দেয়ালে, ফ্যাস্টুনে, ব্যানারে, আলাপচারিতার মধ্যে বাংলা ভাষাকে ছোট করে ভাষার অপব্যবহার বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বাংলা নামটি ছোট করে লিখে ইংরেজিতে নামটি বড় করে লিখা হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা বিধায় সেটিকে আয়ত্ত করতে হবে ভালো কথা কিন্তু সেক্ষেত্রে বাংলাকে করতে হবে মূখ্য ভাষা এবং ইংরেজিকে করতে হবে গৌণ ভাষা এই বিষয়টিকে তরুণ প্রজন্মের খেয়াল রাখতে হবে।

পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে পারিবারিকভাবেও সন্তানদের বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ শিক্ষায় পারদর্শি করে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
স্বাধীনতা-পরবর্তীতে বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারীর একুশ দিনটি আসলে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের রুল জারি সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও দুঃখের বিষয় দিবস চলে গেলে সেই প্রক্রিয়াটি স্তবির হয়ে পড়ে। কিন্তু এত কিছুর পরও সব জায়গায় এখনো বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।

আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে যেমন তথ্যপ্রযুক্তির ওপর জোর দিতে হবে তেমনি বাংলা ভাষার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য, ঐতিহ্য ও নিদর্শন সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের বাংলা ভাষার দুয়ার খুলতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন, দীনবন্ধু মিত্র, গিরিশ চন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র, মীর মোশাররফ হোসেন, কামিনী রায়, রজনীকান্ত সেন, প্রমথ চৌধুরী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার রায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অসংখ্য গুণ্য সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষায় লিখনীর মাধ্যমে বিশ্ব সভায় সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।

আমাদের ঔপনিবেশিক মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ঔপনিবেশিক অসংস্কৃতি এখনো বাংলাদেশে বিরাজমান। এই অপসংস্কৃতিকে দূর করে শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের মাতৃভাষাকে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী। বাংলাদেশে বসবাসরত প্রতিটি নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকলেও এদের মধ্যে বেশির ভাগের ভাষারই নেই নিজস্ব বর্ণমালা। লিখিত রূপ না থাকায় তাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা যেন শুধু আবেগতাড়িত না হয়ে অমর একুশের কথা না বলি। একুশ তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি জনগোষ্ঠী তার নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে। শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে।

বাংলা ভাষার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের এই আত্মত্যাগ তখনই স্বার্থক হবে যখন আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে পুরোপুরিভাবে সব জায়গায় প্রচলন করতে পারবো। অমর একুশের এই দিনে সকল ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
f

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

যশোরে ছেলের বউকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুরকে গ্রেপ্তার।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যশোরের শার্শা উপজেলায় ছেলের বউকে ধর্ষণের অভিযোগে ৬৫ বছর বয়সী এক শ্বশুরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। র‍্যাবের সহযোগিতায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে ঝিনাইদহের মহেশপুর এলাকা থেকে আটক করা হয়।আটক ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান গহর। তিনি শার্শা উপজেলার একঝালা গ্রামের মৃত লুৎফর রহমানের ছেলে।

রূপগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ সহ আহত ৬

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার তারাবো বাজার এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের সংঘর্ষে রনি মিয়া (২৪) নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধসহ ছয়জন আহত হয়েছে। গত ২১মে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত তারাবো উত্তরপাড়া এলাকার শ্রাবণ গ্রুপ এবং দক্ষিণপাড়া এলাকার নবী ভান্ডারীর গ্রুপের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ জানায়, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে তারাবো পৌরসভার উত্তরপাড়া এলাকার শ্রাবণ ও রুবেল গ্রুপের সঙ্গে দক্ষিণপাড়া এলাকার নাজমুল ও নবী ভান্ডারির গ্রুপের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল। ওই বিরোধের জের ধরে ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাতে উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাক্বিতণ্ডা হয়। পরে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও একপর্যায়ে গুলি বিনিময় হয়। দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ৫-৬ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। এসময় ১৩-১৪ টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের ছয়জন আহত হয়।

আহতদের মধ্যে একজন রনি মিয়া(২৪)গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সে চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা। সে নবী ভান্ডারীর পক্ষ নিয়ে সংঘর্ষে যোগ দেয়। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের লোকজন বাড়িঘর, দোকানপাট ও যানবাহনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। হামলাকারীরা তারাবো বাজারের আব্দুর রফিক, মাহমুদ হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাকের ফলের দোকান, সেলিমের রেস্টুরেন্ট সহ তিনটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর এবং লুটপাট করে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাত পৌনে ১২টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে ৩৮ রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। আহতদের উদ্ধার করে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

রূপগঞ্জ থানার ওসি এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে পরিস্থিতি এখন শান্ত। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আলোচিত খবর

পবিত্র ঈদুল আজহায় ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা, ২৩ মে।শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিসে ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এই ছুটি থাকছে। তবে ঈদের আগে সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে আগামীকাল শনিবারের ২৩ মে ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ঈদের ছুটি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঈদুল আজহা উপলক্ষে আগামী ২৫ মে (সোমবার) থেকে ৩১ মে রোববার পর্যন্ত দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। এর আগে ২৩ মে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও পরদিন ২৪ মে রোববার অফিসগুলো খোলা থাকবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ