আজঃ শুক্রবার ১০ এপ্রিল, ২০২৬

ভাষার শক্তি নির্ভর করে জ্ঞানের সমৃদ্ধির ওপর: বিভাগীয় কমিশনার।

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলছেন, ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাই পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে শক্তি জুগিয়েছিল। ১৯৫২ সালের চেতনাই জাতিকে অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে বারবার রাস্তায় নামতে সাহস জুগিয়েছে।

শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ পালন উপলক্ষে আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও একুশের কবিতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ১৯৪৭ সালের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করে।যদিও উর্দু ভাষার নিজস্ব সাহিত্য ও সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে,

তবুও অন্যের ভাষা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি প্রমাণ করে যে, তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং নিজেদের অধিকার আদায় করতে সক্ষম।তিনি আরও বলেন, একটি ভাষার শক্তি নির্ভর করে জ্ঞানের সমৃদ্ধির ওপর। ইতিহাসে দেখা যায়, একসময় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল গ্রিস, পরে আরব বিশ্ব এবং তারপর ইউরোপ।

তারা বিশ্বের নানা ভাষার জ্ঞান নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশেরও উচিত বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার বাংলায় অনুবাদ ও চর্চার মাধ্যমে ভাষাকে আরও শক্তিশালী করা। পৃথিবীর জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষা অন্যতম শীর্ষ ভাষা হলেও অর্থনৈতিক শক্তির অভাবে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি। তাই ভাষার মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সভাপতির বক্তৃতায় বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নয়, বরং এটি ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার বীজ রোপণের ঐতিহাসিক অধ্যায়। বাংলা ভাষা শুধু আবেগের বিষয় নয়-এটি জাতিসত্তার ভিত্তি। বাংলা ভাষা বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চায় এর ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন প্রজন্মকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সঞ্চয় সরকার বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। উপস্থিত ছিলেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। এসময় প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসক পুরস্কার তুলে দেন।

শেয়ার করুন-

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
Share on linkedin

আরও খবর

চট্টগ্রামে শুরু হলো স্বাধীনতার বইমেলা : স্টল ১২৯টি।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

মহান স্বাধীনতার মাসকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে শুরু হয়েছে ১৯ দিনব্যাপী বইমেলা। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে নগরের কাজীর দেউড়ি জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে এ মেলার উদ্বোধন করা হয়, চলবে আগামী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত।উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, একটি নৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, মূল্যবোধ তৈরি করে এবং প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।মেয়র মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

পাহাড়তলী বধ্যভূমিসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে চসিক উদ্যোগ নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রকৃত শহীদদের তালিকা প্রণয়নে সহযোগিতা কামনা করেন।তিনি বলেন, আমরা চাই, চট্টগ্রামের প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষিত হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম সত্য ইতিহাস জানতে পারে।নগর পরিচালনা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, বাংলাদেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু হয়নি।ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিষয় সংরক্ষণে স্থানীয় সরকার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। তবুও চসিকের আওতাধীন এলাকাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ চলমান রয়েছে।মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। যারা জীবনবাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছেন, তাঁদের অনেকেই আজও কষ্টে দিনযাপন করছেন।তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করা হচ্ছে, যা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বইমেলার গুরুত্ব তুলে ধরে মেয়র বলেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না, বরং বই মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে।

তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি সংস্কৃতি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে জানান, চসিক পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ই-লাইব্রেরির ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে বর্তমানে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতা বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।মেয়র নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই শহর আমাদের সবার। সবাই মিলে আমরা চট্টগ্রামকে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও জ্ঞানভিত্তিক নগরীতে পরিণত করতে পারি।

৪০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে মেলায় ১২৯টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি ডাবল স্টল এবং ৯৪টি সিঙ্গেল স্টল রয়েছে। চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকার স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসহ ১১২টি প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিচ্ছে। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকবে।

মেলায় থাকছে বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক আয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্র উৎসব, নজরুল উৎসব, বৈশাখী উৎসব, লেখক সমাবেশ, শিশু ও যুব উৎসব, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠান, কবিতা ও ছড়া উৎসব, আলোচনা সভা, লোকজ ও নৃগোষ্ঠী সংস্কৃতি বিষয়ক আয়োজনসহ নানা অনুষ্ঠান। প্রতিদিনের আলোচনা সভায় লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেবেন।

চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনের সভাপতিত্বে আয়োজনে অংশ নেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপির উপ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, শহিদুল হক চৌধুরী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা একরামুল করিম চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহাবুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামাল, সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মামুন। স্বাগত বক্তব্য দেন সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি শাহাবুদ্দিন হাসান বাবু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কুসুম কুমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক রূমিলা বড়ুয়া। মোনাজাত পরিচালনা করেন চসিকের মাদরাসা পরিদর্শক মাওলানা হারুনুর রশিদ। অনুষ্ঠানে চসিক পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
বুধবার বই মেলা মঞ্চে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ‘একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষিত জাতির বিকল্প নেই’ শীর্ষক বিষয় ভিত্তিক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিজিএমইএ ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি ইউভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল করিম।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলি বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

পাকিস্তান আমলে সক্রিয় ছাত্রকর্মী হিসেবে ছাত্র সমাজের ১১দফা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী । পরবর্তীতে ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করলেও ইয়াহিয়া খানের নানামুখী ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ করে বাঙালী জাতিকে দাবিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

বাঙ্গালী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একজন ভারতীয় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গেরিলা বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধা ছিলাম। এছাড়াও চাকুরীতে যোগদানের আগ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন এবং শ্রমিক সংগ্রামে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আজ পাঠকদের জন্য আমার ছাত্রজীবন ও যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করছি। আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ পিতা- মনোহর আলী, মাতা- ছবুরা খাতুন, গ্রাম- তেকোটা, ডাকঘর- গৈড়লা, উপজেলা পটিয়া, জিলা- চট্টগ্রাম। আমি কৃষক পরিবারের সন্তান, পরিবার কৃষি আয়ের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বাবা মনোহর আলী কৃষক হলেও তিনি ছিলেন গ্রামের মাতাব্বর।

তার কথায় গ্রাম ও সমাজ চলতো। তিনি একজন কৃষক সমিতির নেতাও ছিলেন। পাঁচ ভাই চার বোনের মধ্যে আমিই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। আমি গৈড়লা কেপি উচ্চ বিদ্যালয় হতে এস.এস.সি পটিয়া সরকারী কলেজ হতে এইচ.এস.সি ও ডিগ্রী পাশ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাজনীতি বিজ্ঞানে এম.এ পাশ করি। চট্টগ্রাম আইন কলেজে অধ্যায়ন করি। ছাত্র জীবনের শুরু হতে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হই। তবে সাংগঠনিক ভাবে ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হই। এবং একই সাথে গোপন সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি’র সংস্পর্শে আসি। তৎ সময়ে ১৯৬৮ সালে ছাত্র ইউনিয় পশ্চিম পটিয়া আঞ্চলিক শাখার সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সনে পটিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। ছাত্র ইউনিয়নের একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসাবে ছাত্র ইউনিয়ন ছাড়াও তখন কৃষক সমিতির কাজেও জড়িয়ে পড়ি।

কৃষকদের নানা সমস্যা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কৃষক নেতাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ন্যাপের মনোনয়ন প্রার্থী আনোয়ারা থানার এডভোকেট আবদুল জলিলের নির্বাচন পরিচালনার জন্য আমাকে আনোয়ারায় পাঠান। আনোয়ারায় প্রায় ৩ দিন অবস্থান করি এবং সুচারুভাবে নির্বাচনী কাজ পরিচালনা করি। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হন্তান্তরে পাকিস্তানী সাময়িক শাসক ইয়াহিয়া গড়িমশি শুরু করলে তখন দেশে প্রতিনিয়ত শহর গ্রামে সভা সমাবেশ মিছিল চলতে থাকে।

এতে জনগণের মধ্যে মারাত্মক উত্তেজনা দেখা দেয়। ১৯৭১ এর শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছিল। ৩রা মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে ইয়াহিয়া অধিবেশ বন্ধ করে দেন। উক্ত অধিবেশনে যোগদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান হতে ন্যাপের আবদুল ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ন্যাপের এমপি’রা ঢাকায় আসলেও পাকিস্তানি পিপলস পার্টি’র এমপিরা ঢাকায় আসেনি ভুট্টোর এমপিরা সংসদ অধিবেশ বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় সংসদ অধিবেশ না বসায় পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী জনগণের মধ্যে তীব্র উত্তজেনা দেখা দেয়। দিন রাত মিছিল সমাবেশ চলতে থাকে। তখন শ্লোগান উঠে জাগো জাগো বাঙালী জাগো। বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো।

তোমার আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব এক দফা এক দাবী পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা। যা বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে উচ্চারণ করে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’। দেশে টান টান উত্তেজনা, দেশে কি হবে কি হবে তা নিয়ে মানুষের চোখে ঘুম নেই মানুষের। ৭ই মার্চের ঘোষণার পর মুলত: রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যায়। মানুষের দাবী তখন এক দফা পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা।
এই লড়াই সংগ্রামের ভেতর পাক সরকার সাময়িক সমাধানের দিকে নাগিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্রসস্ত্র আনতে থাকে। চট্টগ্রাম শোয়াত জাহাজে অস্ত্র আনার সংবাদ পেয়ে চট্টগ্রামের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। যার যা আছে লাটি শোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। মেজর জিয়ার উপর দায়িত্ব ছিলো শোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের।

এই খবর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনগণের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায় তখন চট্টগ্রাম শহরে রাস্তায় রাস্তায় সার্বক্ষণিক হাজার হাজার মানুষ। আগ্রাবাদ মেইন রোডে মানুষের পাহাড়া, সকাল বেলা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে কিছু সংখ্যক সৈনিক আগ্রাবাদ রাস্তা দিয়ে শোয়াত জাহাজের দিকে রওনা হলে হোটেল সেন্ট মার্টিনের এলাকায় রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং মেজর জিয়াকে বন্দরের দিকে যেতে দেওয়া হয়নি।২৫ মার্চ মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ঢাকায় গ্রেপ্তারের আগেই বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেশ বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

উক্ত বার্তা চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেন। ২৫ মার্চ মধ্য রাতেই পাকিস্তানী সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেন, এবং ঢাকার রাজবাগ-পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সহ ঢাকা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন পাক বাহিনী। ২৫ মার্চের পর চট্টগ্রামে ক্যাপ্টন রফিকুল ইসলাম ইপিআর বাঙালী সৈনিক নিয়ে বিদ্রোহ করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানী সৈনিকদের প্রতিরোধ করেন। কিছু দিনের মধ্যে পাকিস্তানী সৈনিকদের হাতে চট্টগ্রাম শহরের পতন হলে শহরের মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যেতে থাকে।

এমতাবস্থায়, এলাকার যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে গৈড়লা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে থাকার নেতৃত্বে শত শত যুবকদের সকলবেলা ট্রেনিং এরং ব্যবস্থা করি। সামশুজ্জামান হীন ভাই এর একটি পয়েন্ট ২২ রাইফেল ছিল এবং একজন ইপিআর একটি রাইফেল ছিলো। এভাবে ট্রেনিং ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলে ১৯ তারিখ শুক্রবার বেলা ১১টায় সময় পটিয়া থানা মোড়ে পাকিস্তানী বাহিনী বিমান হামলা করে এতে অনেক লোক হতাহত হন।

বিমান হামলার পর আমাদের ট্রেনিং বন্ধ হয়ে যায়। মূলতঃ এপ্রিল থেকে সমগ্র চট্টগ্রাম পাক বাহিনী ও তাদের দোসর মুসলিমলীগের দখলে চলে যাওয়ায়
স্বাধীনতা যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। আওয়ামী রীগ ও অন্যান্য প্রগতিশীল নেতারা ইতিমধ্যে সীমান্ত পাঁড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছেন আমাদের নেতারাও অনেকে ভারতে। ১৯৭১ এর এপ্রিলের শেষে আমাদের প্রিয় নেতা কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগোয় আমাকে ও সুজিত বড়ুয়াকে আমাদের গ্রামের বৌদ্ধ মন্দিরে গোপনে বৈঠক করে জানালেন যে, ভারতে ন্যাপ কমিউনিট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা হচ্ছে, তাই আমাদের ভারতে যেতে হবে।

কথা মত দুই দিন আমি ও সুজিত ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গোমদন্ডী বকতেয়ার নোমানির বাড়ীতে যাই। সেখানে থেকে গাইডার আমাদের নেয়ার কথা। কিন্তু ঐ দিকে বিকেলে খবর আসে আমাদের নেতা পূর্ণেন্দু কানুনগো কর্ণফুলী নদী পাড় হওয়ার সময় মুসলিমলীগের দালালদের হাতে ধরা পড়েছে। এর কয়েক দিন পর কমরেড কানুনগো দালালদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমার নিকট আসে। বিকল্প পথে অর্থাৎ, মিরশ্বরাই হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন, এবং যাওয়ার বিষয়ে সবিস্তারে ব্রীফ করেন।

তার নিদের্শনা মোতাবেক অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে মিরশ্বরাই ফেনী দিয়ে চৌদ্দগ্রাম, চৌদ্দগ্রামে রাতযাপন করি কাজী বাড়ীতে। পরদিন সকাল বেলা চৌদ্দগ্রাম জগতনাথ দীঘির পাশ দিয়ে বেলোনীয়া বর্ডার অতিক্রম করি। বেলোনী শহরে সিপিআই ক্যাম্পে রাত যাপনের পর পরদিন আগরতলা ক্রেপ্ট হোস্টেল পৌছি। সেখানে দেখি সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দ অবস্থান করছেন। ক্রেপ্ট হোস্টেলে বেগম মতিয়া চৌধুরী আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমরা ভাত খেয়ে সেখান থেকে একটি স্কুলে যাই, সেখানে দেখি ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়েনের কয়েকশত নেতা কর্মচারী অবস্থান করছেন। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর অধ্যাপক মাহাবুবুল হকের পরিচালনায় বি.এস. হোস্টেলে দুই দিন রশিদ আসলেন এবং সবাইকে নীচে নেমে লাইন ধরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি আমাদের ব্রীফ করলেন এবং বললেন আমাদের চূড়ান্ত ট্রেনিং এর জন্য পাঠানো হচ্ছে।

তাই তিনি আমাদের জাতীয় পতাকা দিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করালেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ী এসে আমাদের আগরতলা বিমান বন্দরে নিয়ে গেলেন। সেখানে দাঁড়ানো ছিলো রাশিয়ার একটি কাগো বিমান। সে বিমানে করে আমাদের আসাম সামরিক বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখান থেকে সাময়িক বাহিনীর গাড়ীতে করে তেজপুর সেনা নিবাসে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে আমাদের দুই মাসের বেশী সময় গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, ট্রেনিং শেষে ত্রিপুরা বাইকোরা নামক স্থানে ক্যাম্পে আশা হয় কয়েক দিন পর সাবরুম বর্ডার হয়ে ভারতীয় বর্ডার গার্ডের সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করি।

বর্ডার পাড় হয়ে চাকমা উপজাতীয় সহযোগিতায় কারণ আমাদের সমস্ত গোলা বারুদ বহন করেন তারা, তাদের মাধ্যমে ফটিকছড়ি নারায়ন হাট হয়ে বোয়ালখালী চলে আসি। বোয়ালখালী থেকে যে দিন পটিয়া গোপাল পড়া প্রবেশ করি, সেদিন সকাল বেলা আমাদের সাথে পাক বাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাক বাহিনীর সহযোগী কয়েকজন মারা গেলেও আমাদের কেউ হতাহত হননি।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর হতে করলডেঙ্গা রসহরী মহাজনের বাড়ীতে ক্যাম্প এবং করলডেঙ্গা পাহাড়ে ছালতাছড়ি নামক স্থানে ট্রেনিং সেন্টার করে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে ধলঘাট ষ্টেশন দখলের যুদ্ধ, ইন্দ্রপুল ধ্বংস করা, গৈড়লার টেকে ঐতিহাসিক সম্মুখে যুদ্ধ এবং যুদ্ধে জয় লাভ, পটিয়া থানায় জাতীয় জতাকা উত্তোলন সহ ছোট কাটো আরো অনেক অপারেশনে অংশগ্রহণ করি।

কমরেড শাহ আলমের নেতৃত্বে ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ১৯ জন গেরিলা বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও স্থানীয় ভাবে করলডেঙ্গা পাহাড়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিরাট গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর পটিয়া সেচ্ছাসেবক বিগ্রেড প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করি। ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পটিয়া থানার সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন শেষে প্রথমে চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগে চাকুরী করি। এর পর ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দান করি। (বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত)।

সংসার জীবনে আমার চারকন্যা, বড় মেয়ে সাবরিনা বিনতে আহমদ (সাকী), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমবিএ পাশ করে, ২য় মেয়ে মায়মুনা জেসমিন পিংকি এম.বি.বি.এস ডাক্তার, ৩য় মেয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর কম্পিউটার স্নাতকত্তোর ডিগ্রি অর্জন করেন। ৪র্থ মেয়ে সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এইচ.এস.সি ১ম বর্ষের ছাত্রী, তার স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার। বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করছি সমাজের জন্য।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানিক কমান্ডের ২০ বছর কমান্ডার ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের সভাপতি, চট্টগ্রাম বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতির সভাপতি, সেক্টর কমান্ডার ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ এর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধকালিন ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের চট্টগ্রাম জেলার সদস্য সচিব। হিসেবে আছি।
চট্টগ্রাম নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমার রাজনৈতিক গুরু মাস্টার আবদুস সালাম।

উল্লেখ্য যে, আমার গেরিলা দলে ছিলেন কমরেড শাহ আলম, সামশুজ্জামান হীরা, মো: ইউছুপ, কাজী আনোয়ার, নজরুল ইসলাম, শেখর দস্তিদার, পুলক দাশ, তপন দস্তিদার, মো: আলী, মোজাফ্ফর হোসেন, খামরুজ্জামান, সুজিত বড়ুয়া, প্রিয়তোষ বড়ুয়া, ভূপাল দাশ, মিয়া জায়র আহমদ, গোলাম মাওলা প্রমুখ।

আলোচিত খবর

৫ বছরে বিএসসি বহরে যুক্ত হতে পারে আরো ২২ টি জাহাজ।

সোশ্যাল শেয়ার কার্ড

এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

ছবি-৮
চট্টগ্রাম ব্যুরো: বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) বহর সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে ‘ওয়ান শিপ পলিসি’ গ্রহণ করেছে। এ নীতির আওতায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত আর্থিক সক্ষমতা সাপেক্ষে প্রতিবছর অন্তত একটি করে জাহাজ নিজস্ব অর্থায়নে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। তবে এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে নতুন জাহাজ কেনার আগে বিদ্যমান বহরের অপারেশন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষিত থাকতে হবে। অর্থাৎ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেই বিনিয়োগ বাড়াবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসসি।

বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে প্রধান কার্যালয়ে বিএসসির বর্তমান কর্মকান্ড এবং ভবিষৎ পরিকল্পনা নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানান বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, আমরা একটা ফিলোসফি ডেভেলপ করেছি, ‘ওয়ান শিপ ফিলোসফি’। ২০৩০ সাল পর্যন্ত আর্থিক সক্ষমতা ঠিক থাকলে প্রতি বছর একটি করে জাহাজ নিজস্ব অর্থায়নে কেনার লক্ষ্য রয়েছে। এটার নাম দিয়েছি “ওয়ান শিপ পলিসি”। তবে কন্ডিশন আছে। কন্ডিশন হচ্ছে বাকি জাহাজগুলো অপারেশন করার জন্য সেই পরিমাণ অর্থ আগে স্টকে বা ব্যালেন্স থাকতে হবে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সরকারি অর্থায়নে দুটি এমআর (মিডিয়াম রেঞ্জ) প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং নিজস্ব অর্থায়নে একটি বাল্ক ক্যারিয়ার কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকায় দুটি এমআর ট্যাংকার ক্রয় প্রস্তাব একনেক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দুটি এমআর ট্যাংকার কেনার ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা অলরেডি স্যাংশন হয়ে গেছে। এছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে একটা বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ কেনার প্রকল্পটি মন্ত্রনালয় থেকে হয়তো দুই একদিনের মধ্যে একনেকে চলে যাবে।
একনেকে দুইটা প্রজেক্ট অনুমোদন হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা আশা করছি সবকিছু ঠিক থাকলে পরবর্তী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে এই তিনটা জাহাজ বিএসসির বহরে যুক্ত হবে।

তিনি আরও জানান, চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে চারটি জাহাজ সংগ্রহের প্রকল্পে অগ্রগতি হয়েছে। এ প্রকল্পে দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার ও দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ পবে বিএসসি। এরইমধ্যে গত মাসে ফ্রেমওয়ার্ক ও ঋণচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং চীনা পক্ষের স্বাক্ষর প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। আগামী মাস থেকে জাহাজের স্টিল কাটিং ও নির্মাণকাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ৬টি কনটেইনার ভেসেল কেনার জন্য আমরা দীর্ঘদিন যাবত কাজ করছি। ঋণদাতা হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে। তারা ছয়টা কন্টেইনার ভেসেল তৈরি করার টাকা ফান্ডিং করবে। প্রসেস চলমান আছে। তাদের সাথে টার্মস এন্ড কন্ডিশন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। লোনের ইন্টারেস্ট রেট কত হবে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে দুই তিন বছরের মধ্যে জাহাজগুলো বিএসসির বহরে যুক্ত হবে। প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা ২৫০০ থেকে ২৮০০ টিইইউ এবং ড্রাফট প্রায় ৯ দশমিক ৮ মিটার হবে। এগুলোদিয়ে ফিডার জাহাজ হিসেবে সিঙ্গাপুর এবং শ্রীলঙ্কা থেকে আমরা কার্গো আনা নেওয়া করতে পারবো। যা জাতীয় ট্রান্সপোর্টেশনের ক্ষেত্রে জাহাজগুলো ব্যাপক অবদান রাখতে পারবে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া আরও ৩টি বাল্ক ক্যারিয়ার ও ৩টি এমআর ট্যাংকার সংগ্রহের জন্য কাজ চলছে। জাহাজ সংগ্রহে জাপানকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশন হয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং জাপানের প্রাথমিক সম্মতিও পাওয়া গেছে বলে জানান বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাছাড়া আরও ২টি বাল্ক ক্যারিয়ার ও ২টি ট্যাংকার সংগ্রহের প্রস্তাবও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এগুলোর জন্য বর্তমানে অর্থায়নের উৎস খোঁজা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, বিএসসির ২২টি জাহাজ সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা আছে। ২২টি জাহাজ নিয়ে একটি সমন্বিত বহর গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তার মধ্যে দুইটা অলরেডি বহরে যুক্ত হয়েছে। পাইপলাইনে আছে আরও সাতটা। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি দুই এক বছরের মধ্যে ১৪টা জাহাজ আমরা বহরে যুক্ত করতে পারবো। এবং সমস্ত প্রসেস যদি ঠিক থাকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিএসসির বহরে ২২ টা জাহাজ থাকবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ