

আগামী জুলাই-আগস্টে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি আওতায় দেশজুড়ে এক কোটি ৯৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।এরই মধ্যে দেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে বড় ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে টিকা দেশে পৌঁছোর পর এ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে এপ্রিলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হাম প্রতিরোধে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অধীনে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই রোগ প্রতিরোধে ছয় বছর পরপর বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও করোনা মহামারির কারণে ৩১ শতাংশ শিশু সঠিক সময়ে টিকা নিতে পারেনি।

এ ছাড়া গত বছরও টিকা সংকট দেখা দেয়। অনেক শিশু টিকার বাইরে ছিল। এই কারণেও হাম বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৬০৪ কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন । তিনি অভিযোগ করে বলেন, অতি সংক্রামক এ রোগটির সময়মতো টিকা না দেওয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে। তবে এবার আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাতে তারা সুস্থ হচ্ছে। হামের রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ডিএনসিসি হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো সব প্রস্তুত করা হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, নর্থবেঙ্গল মেডিকেল এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখন প্রস্তুত রয়েছে।
জায়গা না পেয়ে একাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর সরকার পাঁচটি ভেন্টিলেটর দান পেয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ সমকালকে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক জোট গ্যাভি সহায়তায় ৬ বছর পরপর বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি করা হয়। এ জন্য ইতোমধ্যে টিকা চলে এসেছে। মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে দুই কোটি সিরিঞ্জ দেবে। এখন অর্থায়ন পেলে এপ্রিলে এই টিকা প্রয়োগে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

তিনি আরও জানান, উদ্বেগের বিষয় হলো– আক্রান্তের ৩৩ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম। এ জন্য আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ করে ছয় মাস বয়স থেকে এই টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, হামে আক্রান্ত হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং সে কারণে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যায়। বেশির ভাগ সময় হামে আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) মইনুল আহসান বলেছেন, কমবেশি সারাদেশেই হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বড় ১০টি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সব আইসিইউতে এসব রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আলাদা করে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলা, বরগুনা, নোয়াখালী ও নওগাঁ সংক্রমণ বেশি। অন্য জেলাতেও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। তবে অধিদপ্তরের কাছে আক্রান্ত মৃত্যুর সঠিক তথ্য নেই। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের শুরু থেকে চারশর বেশি রোগী হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছে, যাদের অধিকাংশের হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন সেখানকার একজন কর্মকর্তা।
খুলনা বিভাগে ৭৮ শিশু ভর্তি, ৬৩ জন কুষ্টিয়ার
খুলনা বিভাগের ছয় জেলায় গতকাল রোববার নতুন করে ১০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার দুটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৬৩ শিশু। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে আইসিইউ ওয়ার্ডকে অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তর করা হয়েছে। অনেকে করিডোরে চিকিৎসা নিচ্ছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম জানান, হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ১৩ রোগী। হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডকে আইসোলেশন সেন্টার ঘোষণা দিয়ে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতি কিছুটা উদ্বেগজনক। হামের লক্ষণ নিয়ে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ১৩ এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া যশোরে ছয়জন, খুলনায় তিনজন, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও সাতক্ষীরায় দুজন করে রোগী ভর্তি রয়েছেন।আক্রান্ত শিশুর মধ্যে ছয় মাসের কম বয়সী চারজন, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী সাতজন, ৯ থেকে ১১ মাস চারজন, এক বছর থেকে চার বছরের মধ্যে ছয়জন, ৫ বছর থেকে ৯ বছরের মধ্যে দুজন। এ ছাড়া ২০ বছরের নিচে তিনজন হাম আক্রান্ত হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে জানা গেছে, হাম উপসর্গ নিয়ে তিন শিশু গুরুতর অবস্থায় আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে। আট মাস, সাত মাস ও পাঁচ মাস বয়সী এই তিন শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।ময়মনসিংহে ১২ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হওয়ায় গত ১২ দিনে এই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচে। রোববার দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতালের বিশেষায়িত ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৬ জন শিশু।চাঁপাইনবাবগঞ্জে রোগীর ৪০ শতাংশ শিশু
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৪০ শতাংশই শিশু, চলতি মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুসহ গত তিন মাসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৪৩ শিশু। এর মধ্যে মার্চের ২৯ দিনে ভর্তি হয়েছে ৪৬ জন।
রোগীর চাপ সামাল দিতে জানুয়ারির শেষ দিকে হাম কর্নার চালু করা হয়। পরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে নতুন ভবনের কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটকে অস্থায়ী আইসোলেশন ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়। ২০ শয্যার এই ইউনিটে বর্তমানে ৭০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন। অনেককে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, আবার এক বিছানায় দুই রোগীকেও থাকতে দেখা গেছে।
হাসপাতালে আইসিইউ ও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় গুরুতর অবস্থার অন্তত ৮০ শিশুকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আইসোলেশন ইউনিটে মাত্র দুজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
রাজশাহীতে একই ওয়ার্ডে হাম ও অন্যান্য রোগী
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের লক্ষণযুক্ত শিশুদের আলাদা আইসোলেশন ছাড়া সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুরা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও চিকিৎসকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নমুনা পরীক্ষায় হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের আইসোলেশনে রাখা হলেও, যাদের লক্ষণ আছে কিন্তু পরীক্ষা হয়নি, তাদের শিশু বিভাগের ১০ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে অন্যান্য রোগীর সঙ্গে রাখা হচ্ছে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন-শনাক্ত হওয়া রোগীদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। তবে পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউতে ১২টি বেড রয়েছে এবং গুরুতর রোগীদের সেখানে সেবা দেওয়া হচ্ছে। নওগাঁ জেলায় হাম প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত জেলায় সন্দেহজনক ৩৫ জন হাম-রুবেলা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি উপজেলায় চার শিশুর শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
বরগুনায় হঠাৎ করেই হামের প্রকোপ বেড়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৭৪ জনের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং ২২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া একজনের রুবেলা ধরা পড়েছে। এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ বলেন, সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্তদের আলাদা রাখা হচ্ছে। তিনি দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
চট্টগ্রামে এক সপ্তাহে ১২ শিশু ভর্তি

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক সপ্তাহে হামে আক্রান্ত ১২ শিশু ভর্তি হয়েছে। অনেকের শরীরে নিউমোনিয়াসহ জটিলতা দেখা দিয়েছে। শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, আক্রান্ত শিশুদের আলাদা কর্নারে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, টিকা না নেওয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় সংক্রমণ বাড়ছে।
সংগৃহীত –
[email protected]