এই কার্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম মহানগরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মহানগরের বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, বায়েজিদ ও খুলশী এলাকায় দুই দিনে তিনজন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়- পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে শিশু সুরক্ষায় কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলার ধীরগতি এবং জামিনে এসে আসামিদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পেয়ে যায়।

এদিকে শনিবার চিকিৎসাধীন ওই ধর্ষিতা তিন শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ(চমেক) হাতসপাতালে দেখতে যান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এসময় হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্যের বরাত দিয়ে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, গত ৮ বছরে চট্টগ্রামে ১২ বছরের নিচে ৪২২টি শিশু নির্যাতনের ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে রিপোর্ট না করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও উদ্বেগজনক হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।শিশু নির্যাতন ও ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে আইন সংশোধনের দাবি জানান মেয়র।
সমাজবিজ্ঞানী ও আইনজীবীরা বলছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় অভিযোগ গঠনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া বা তদন্তে ধীরগতির কারণে মামলার কার্যক্রম ঝুলে থাকে। এই সুযোগে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো কিংবা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। জানা গেছে, একের পর এক বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে সিএমপি’র ১৬ থানায় ১৪৯টি মামলা হয়েছে।অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন একটি করে মামলা দায়ের হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিশুর ওপর নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টার পেছনে একাধিক সামাজিক, মানসিক ও অপরাধপ্রবণতা কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে বিকৃত মানসিকতা, নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক সহিংস পরিবেশ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক অপরাধী শিশুদের দুর্বল ও সহজ টার্গেট মনে করে। তারা বিশ্বাস করে- শিশুরা ভয়, লজ্জা বা অক্ষমতার কারণে সহজে প্রতিবাদ করতে পারবে না।
জানা গেছে, গত ২১ মে নগরের বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মনির হোসেন (৩০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শিশুর বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। এর পরদিন নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশী মো. হাসান (৪২) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকায় ৭ ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশুকে ডেকে নিয়ে একটি খালি প্লটে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে মো. এহসান (৫৫) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে তাকে আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায়। গ্রেফতার এহসান একটি বাসার নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিল বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে আগে থেকেই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রথমবার অপরাধ করে দায়মুক্তি পাওয়ায় তারা পুনরায় অপরাধে জড়ানোর সাহস পায়। বিশেষ করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়া এবং সহজে জামিন পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমিয়ে দিচ্ছে। তাই শুধু অপরাধীদের নয়, যারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় কিংবা বিচার এড়িয়ে যেতে সহায়তা করে, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ক্রাইম) মো. রইছ উদ্দিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এসব মামলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রত্যেক থানাকে তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট বা পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি অপরাধীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পুলিশের ওপেন হাউস সভা, মাদকবিরোধী প্রচার ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিতেও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর পিপি মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ বলেন, শিশু ধর্ষণ মামলায় ট্রাইব্যুনালে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দ্রুত বিচার সম্পন্নের বিধান রাখা হয়েছে। ১৬ বছরের নিচের শিশুদের মামলাগুলো এখন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্পিড ট্রায়ালের আওতায় বিচার হচ্ছে। তবে সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিলম্বসহ কিছু কারণে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। তবুও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।











