
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ নামে আরেকটি অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। শনিবার(১৮ জুলাই) চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অ্যাপটির উদ্বোধন করবেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। নতুন এই অ্যাপটিও কতদিন সচল থাকবে তা নিয়েও অনেক আলোচনা। কারণ এটি ব্যবস্থাপনার জন্য যে জনবল প্রয়োজন তা সিটি করপোরেশনের নেই। এর আগে কখনো তেল চুরি, কখনো আবার হোল্ডিং ট্যাক্স আত্মসাৎ রোধে অ্যাপ চালু করেলেও কোনোটিই চালু রাখতে পারেনি। সুফল পায়নি নগরবাসীও।

জানতে চাইলে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আমিন বলেছেন, এই অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান যেমন করা হবে, তেমনি কোথাও নতুন সড়ক কিংবা ফুটওভার ব্রিজ প্রয়োজন হয়, সেগুলো পরবর্তী কর্মপরিকল্পনায় রাখা হবে। এই এক অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিক সব সমস্যা এক জায়গা থেকে সমাধান করা যাবে। এটি শুধু সমস্যা সমাধান করবে না, সমাধানের পর অভিযোগকারীকে বিষয়টি জানিয়েও দেবে। মেয়র থেকে ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তারা এটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করবেন। জনবল সংকটের কারণে অ্যাপ ব্যবস্থাপনা করা চ্যালেঞ্জ স্বীকার করে তিনি বলেছেন, নতুন জনবল কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলছে। সেখানে পর্যাপ্ত লোকবল রাখা হবে।
অ্যাপের ইন্টারফেস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এতে রাস্তাঘাট, মশার উপদ্রব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, নালা-নর্দমা, পাবলিক টয়লেট, অবৈধ স্থাপনা ও জলাবদ্ধতাসহ মোট ১০টি ক্যাটাগরিতে ছবিসহ অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। ‘সমাধান কাউন্টারে’ অভিযোগের লাইভ পরিসংখ্যান দেখা যাবে। আছে জরুরি হটলাইন ‘৯৯৯’, নারী-শিশু সেবা, স্কুল হেলথ কার্ড ও বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রের আবেদন সুবিধা এবং মেয়র-কাউন্সিলরদের যোগাযোগের তথ্য। অ্যাপটি তৈরি করেছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভেনটো টেক। অর্থায়ন করেছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড। ব্যয় হচ্ছে তিন কোটি টাকা।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে গৃহকর এবং ট্রেড লাইসেন্স ফি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু করেছিল তৎকালীন মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম চৌধুরী। কিন্তু সিটি করপোরেশনের প্রচারণার অভাব ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনীহার কারণে এটি কার্যকর হয়নি। এখনো সার্ভারটি চালু আছে। কিন্তু হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা হয় ম্যানুয়েল বা সনাতন পদ্ধতিতে। এতে নাগরিকদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
একাধিকবার তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও তুলে ধরা হয় বলে জানা গেছে। সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা না দিয়ে হোল্ডিং ট্যাক্স আত্মসাৎ করায় অন্তত তিনজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এর আগে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, নগরবাসী যদি ঘরে বসেই অনলাইনে কর পরিশোধ করতে পারেন, তবে কর আদায়কারীদের টেবিল পর্যন্ত আসার প্রয়োজন পড়বে না। এতে অনেকের নিয়মিত অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। মূলত এই কারণে তারা নাগরিকদের অনলাইনে গৃহকর দিতে অনুৎসাহিত করেন।
এ বক্তব্যের প্রমাণ মিলেছে তৈয়ব ইসলাম নামে এক যুবকের অভিযোগে। তিনি তার প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ট্রেড লাইসেন্স করতে গত ১২ জুন রাজস্ব সার্কেল-৫-এ আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ‘সার্ভার ডাউন’ এ অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছেন। জানতে চাইলে রাজস্ব সার্কেল-৫-এর কর কর্মকর্তা (লাইসেন্স) হাসান ওসমান গনি বলেছেন, আবেদন ঢাকা থেকে অনুমোদন হয়ে আসতে হয়। সার্ভার ডাউনের কারণে অনেকের লাইসেন্স পেতে দেরি হচ্ছে।
সংকট এখানেই শেষ নয়। ঢাকার এটিএন অ্যান্ড আরকে সফটওয়্যার লিমিটেড এই অটোমেশন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে বছরে দিতে হয় ৮৩ লাখ টাকা। চুক্তিতে এ কথা উল্লেখ থাকলেও চার বছরে ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা সিটি করপোরেশনের।
অর্থ পরিশোধ না করায় অনলাইনের এই কার্যক্রম এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হোল্ডিং ট্যাক্স সংগ্রহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে সিটি করপোরেশন। ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি সিটি করপোরেশনের বাণিজ্যিক হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে বি-ট্র্যাক সলিউশনস লিমিটেড এবং মাইলেজ নামে দুইটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি করে। অথচ সিটি করপোরেশনের বাণিজ্যিক হোল্ডিং চিহ্নিত করা নেই। তাদের দুই ধরনের হোল্ডিং রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি। হোল্ডিং ট্যাক্স অটোমেশন নিয়ে চুক্তি হলেও কোনো উদ্যোগই আলোর মুখ দেখেনি।
সূত্র জানায়, ২০১২ সালে সাবেক মেয়র মনজুর আলমও আরেকটি হোল্ডিং ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করেছিল। একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইটও প্রস্তুত করা হয়েছিল। অ্যাপটি তৈরি করেছিল এস অ্যান্ড টি ট্রেডিং। ব্যয় হয়েছিল ১৮ লাখ টাকা। পরে সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেও পারেননি।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল চালু হয় নাগরিক অভিযোগ কলসেন্টার (১৬১০৪)। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই অভিযোগের নম্বরটি। কিন্তু ২০২০ সালের শুরুতে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই বছরের ৩১ জুলাই সিটি করপোরেশনের সেবা নিয়ে আরেকটি অ্যাপ চালু করা হয়েছিল। বিল পরিশোধ না করায় মাত্র দুই বছরের মাথায় তা বন্ধ করে দেয় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান।
এদিকে গাড়ির তেল চুরি ঠেকাতে ২০১৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ভিটিএস (ভেহিক্যাল ট্রেকিং সিস্টেম) চালু করেছিল তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। কিন্তু পরীক্ষামূলক সে প্রক্রিয়া আর পরিপূর্ণ আলোর মুখ দেখেনি। ছয় মাসের মধ্যে তা বন্ধ হয়ে যায়। এতে ব্যয় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে গতি আনতে এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা রোধে মুঠোফোনের মাধ্যমে অবস্থানগত এলাকা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ছয়শ পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে সিম দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে গতি এসেছিল। প্রযুক্তির সহায়তায় কর্মীদের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টিও রোধ করা হয়। কিন্তু কয়েক মাসের মাথায় সেটিও বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা গেছে।