
রমজান মাসকে সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের বাজারে দাম ওঠানামা শুরু হয়েছে। রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা ডালজাতীয় পণ্যের দাম এবার কম। বিশেষ করে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় রোজাদারদের ইফতারের অনুসঙ্গ ছোলার দাম বাড়ার সম্ভবনা নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ৭ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৮ টন ছোলা। এর বাইরে আগের বছরের অবিক্রিত ছোলাও রয়েছে বাজারে।
সরেজমিন দেশের সবচেয়ে বড় ভোগপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে দেখা গেছে, আড়তে প্রচুর ছোলার সরবরাহ। টেবিলে ছোট ছোট বাটিতে বিভিন্ন মানের ছোলার নমুনা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ ছোট স্বচ্ছ বোতলে, বাটিতে পানি দিয়ে ছোলা ভিজিয়ে রেখেছেন, যাতে ক্রেতাদের সন্দেহ না থাকে। দূরদূরান্ত থেকে খুচরা বিক্রেতারা কিনছেন ছোলা। প্রতিকেজি অস্ট্রেলিয়ার ছোলা পাইকারিতে ৭২ থেকে ৮৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্তানি কাবলি ছোলা (সাদা) পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মজুতের পাশাপাশি আমদানি বেশি হয়েছে ছোলা। দামও হাতের নাগালে। সরকার থেকে পাওয়া বিশেষ সুবিধায় বিপুল পরিমাণে ছোলা আমদানি হয়েছে। চাহিদার চেয়ে বেশি থাকায় এবার ছোলার বাজার চড়া হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। উল্টো ধীরে ধীরে দাম আরো কমবে। গত বছরের তুলনায় দাম বাড়তি থাকার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কূটকৌশল এবং অন্য পক্ষ ডলারের উচ্চ দর বলে মনে করছেন।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাইতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছোলা খালাস হয়েছে ৪৯৮ টন, আগস্টে ৮৮৩ টন, সেপ্টেম্বরে ৮৭০ টন, অক্টোবরে ৫ হাজার ১৭৭ টন, নভেম্বরে ৪২ হাজার ৩৪৩ টন, ডিসেম্বরে ৫৭ হাজার ৪৬১ টন, জানুয়ারিতে ৭৯ হাজার ৭৭১ টন এবং ১-১০ ফেব্রুয়ারি ৭ হাজার ৭৯৫ টন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৬ মেট্রিক টন ছোলা আমদানি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছিল মাত্র ১ লাখ ৬৬ হাজার ১২৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় এবার ১ লাখ ২৮ হাজার ৯২৯ মেট্রিক টন বা প্রায় ৭৭.৬১ শতাংশ বেশি ছোলা আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন ছোলা আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বেশিরভাগ ছোলা আমদানি হয় অস্ট্রেলিয়া থেকে। এ বছর আমদানি স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে। ইতিমধ্যে প্রায় ২ লাখ মেট্রিকটন ছোলা খালাস হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।কিছু ছোলা পাইপলাইনে আছে। সেগুলো দ্রুত খালাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। রোগ ও পোকামুক্ত, কোয়ালিটি হয়েই ছাড়পত্র দিচ্ছি আমরা। এবার ছোলার বাজারে অস্থিরতা বা দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ থাকবে না।
এদিকে ছোলার বড় আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, আমদানিকারকরা পাইকারদের কাছে প্রতি ছোলা মণ ২ হাজার ৬০০ টাকা বিক্রি করছেন। এ পর্যায়ে প্রতি কেজি ছোলা ৬৯ টাকা। সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির ছোলা ৭৪ টাকা। তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ায় ছোলার হারভেস্টিং মৌসুম শুরু হয় অক্টোবরে।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, রমজান সামনে রেখে চাক্তাই খাতুনগঞ্জের আড়তে উৎসবমুখর পরিবেশে বেচাবিক্রি হচ্ছে। গত বছর যে অস্ট্রেলিয়ার ছোলা আড়তে ১০০-১০৪ টাকা, সেই ছোলা এবার বিক্রি হচ্ছে ৭৪-৭৫ টাকা। নিম্নমানের ছোলা ৭২ টাকা। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ছোলা ৮০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এবার অস্ট্রেলিয়ায় ছোলার দাম কম ও ডলার সংকট না থাকায় প্রচুর ছোলা এসেছে। যথেষ্ট এলসি খোলা হয়েছে। কোনো সংকট হবে না। পর্যাপ্ত ছোলা আছে বাজারে। রমজানের চাহিদা মিটিয়ে আরও কয়েক মাস খেতে পারবে মানুষ।
ক্রেতারা মনে করছেন, বর্তমান বাজারদর গত বছরের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। গত বছর রমজানের আগে ছোলার কেজি ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় উঠলেও এবার মানভেদে ৭৫ থেকে ৮২ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে ছোলা কিনতে পারছেন ক্রেতারা।পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণে শক্ত মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, কোনো ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা চরম ভোগান্তির শিকার হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।